ছবি: সংগৃহীত
যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করা, ড্রোন পরিচালনা এবং প্রতিপক্ষের যোগাযোগব্যবস্থার বাধা এড়িয়ে অভিযান চালানো—আধুনিক যুদ্ধে এসব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট। যুদ্ধের ময়দান থেকে শত শত মাইল দূরে অবস্থান করেও এর সাহায্যে আকাশযান পরিচালনা ও সামরিক কার্যক্রম সমন্বয় করা সম্ভব হচ্ছে। এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে এবার নিজস্ব স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে রাশিয়া। ‘রাসভেত’ নামের এই প্রকল্পকে মার্কিন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের স্টারলিংকের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে স্টারলিংকের ভূমিকা এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে উচ্চগতির ইন্টারনেট ও যোগাযোগসেবা দিয়ে ইউক্রেনের সামরিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করছে এই ব্যবস্থা। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে অবস্থান করেও ড্রোন পরিচালনা এবং বিভিন্ন সামরিক কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব হচ্ছে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যোগাযোগ বজায় রাখার ক্ষেত্রেও স্টারলিংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তবে এই সুবিধা থেকে রাশিয়াও একপর্যায়ে লাভবান হচ্ছিল বলে জানা যায়। যুদ্ধের শুরুতে ইউক্রেন স্টারলিংক ব্যবহারের সুযোগ পেলেও রাশিয়া অননুমোদিতভাবে এই সেবা ব্যবহার করছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে স্পেসএক্স রুশ বাহিনীর সেই প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেয়। এর পরপরই রাশিয়া প্রায় ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা হারায় বলে পেন্টাগনের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নিজস্ব স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা মস্কোর কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনের স্টারলিংক ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের খবরের মধ্যেই রাসভেত প্রকল্প নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে অন্তত ৯০০টি স্যাটেলাইট স্থাপন করা হবে। বর্তমানে এই নেটওয়ার্কে ৩১টি স্যাটেলাইট রয়েছে। এগুলো যুদ্ধের সম্মুখসারিতে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করলেও প্রতিদিন মাত্র কয়েক ঘণ্টা কার্যকর থাকে। এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে আগামী বছরের মধ্যে স্যাটেলাইটের সংখ্যা বাড়িয়ে ২৯২টিতে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে মস্কো।
স্যাটেলাইটের সংখ্যা বাড়লে যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগের পরিসর ও কার্যকর থাকার সময় বাড়তে পারে। ফলে স্টারলিংকের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি সামরিক কার্যক্রম পরিচালনায় রাশিয়ার নিজস্ব সক্ষমতাও বাড়বে। তবে এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, স্যাটেলাইটগুলোকে নির্ধারিত কক্ষপথে স্থাপন করতেই রাশিয়ার মহাকাশ সংস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। এ কারণে ২০২৭ সালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি যা-ই হোক, মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রচলিত অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন স্যাটেলাইট যোগাযোগও যুদ্ধের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। রাসভেত প্রকল্প সফল হলে রাশিয়ার সামরিক যোগাযোগব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। তবে পরিকল্পনাটির বাস্তবায়ন কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করছে নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্যাটেলাইট কক্ষপথে স্থাপন ও কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর।
তথ্যসূত্র : ইউএসএ টুডে ও ইউএ নিউজ।