ঢাকা
৩০ অক্টোবর ২০২৬
Advertise with us

হঠাৎ কেন দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে কিমের বিরোধ তুঙ্গে উঠল?

ডেস্ক রিপোর্ট
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬   ১৪ বার পঠিত
হঠাৎ কেন দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে কিমের বিরোধ তুঙ্গে উঠল?

ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে থাকা নিজের সীমান্তে ব্যাপক সামরিকীকরণ ও স্থায়ী দুর্ভেদ্য প্রাচীর নির্মাণের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া মূলতঃ দুই দেশের মধ্যকার ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমানাকে একেবারে নতুন রূপ দিতে চাইছে। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে সীমান্তে ফের লাউডস্পিকারের মাধ্যমে প্রোপাগান্ডা প্রচার শুরুর ঘোষণার মধ্য দিয়ে এই বিবাদ নতুন করে শিরোনামে এসেছে। তবে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং-উনের দীর্ঘ পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টাতেই যে কয়েক বছর ধরে এই সীমান্তকে একটি সামরিক দুর্গে পরিণত করার কাজ চলছে, তা এখন স্পষ্ট। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাস থেকে ডি-মিলিটারাইজড জোন (ডিএমজেড) এলাকাজুড়ে একটি স্থায়ী সুরক্ষিত সীমানা তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে পিয়ংইয়ং। এই বিস্তৃত কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়েই সম্প্রতি ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, যেখানে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা সদস্য গুরুতর আহত হন। আর এতেই দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

কোরীয় উপদ্বীপকে দুই ভাগে বিভক্তকারী প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৪ কিলোমিটার প্রশস্ত ডিএমজেড এলাকাটি বহু আগে থেকেই বিশ্বের অন্যতম ভারী মাইনসংলগ্ন অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ২০২৪ সালের পর থেকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ধারণামতে, সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়া ডিএমজেড এলাকায় প্রায় ৯ লাখ ৬০ হাজার নতুন ল্যান্ডমাইন পুঁতেছে, যা আগে থেকেই বিদ্যমান মাইন সংখ্যার প্রায় অর্ধেক। কেবল মাইন নয়, পুরো সীমান্ত জুড়ে একটি নিরবচ্ছিন্ন ভৌত বাধা গড়ে তুলছে দেশটি। সব ধরনের গাছপালা ও ঝোপঝাড় কেটে পরিষ্কার করা জমিতে তারের বেড়া দেওয়ার পাশাপাশি তৈরি করা হচ্ছে মাইনফিল্ড, কৌশলগত সড়ক এবং ট্যাঙ্ক-বিরোধী বাধা। দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ জানিয়েছে, সীমান্ত পরিষ্কারের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং নির্মাণকাজের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৮ সালের শেষার্ধের মধ্যেই এই বিস্তৃত প্রাচীর তৈরির কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

১৯৫৩ সালে যে অস্ত্রবিরতি চুক্তির মাধ্যমে কোরীয় যুদ্ধ স্থগিত হয়েছিল, সেই চুক্তি অনুযায়ী এই ডিএমজেড এলাকাকে যেকোনো ধরণের সামরিক বাহিনী ও সরঞ্জাম মুক্ত রাখার বিধান ছিল।

কিম জং উনের সীমান্তে এই সামরিক তৎপরতার পেছনে মূল কারণ হলো একসময় অত্যন্ত গুরুত্ব পাওয়া ‘কোরীয় পুনরেকত্রীকরণ’ বা দুই কোরিয়াকে এক করার নীতি থেকে পুরোপুরি সরে আসা। ২০১৮ সালেও দুই দেশের নেতারা সীমান্ত এলাকায় মুখোমুখি সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং শীতকালীন অলিম্পিকে একই পতাকার নিচে দুই দেশের অ্যাথলিটরা মার্চ করেছিলেন। কিন্তু ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কিম জং-উন দক্ষিণ কোরিয়াকে সম্পূর্ণ একটি পৃথক ও শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন। আর এই ঘোষণার ঠিক কয়েক মাস পর থেকেই সীমান্তে স্থায়ী প্রাচীর নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়।

সিউলের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, কিমের এই আকস্মিক নীতি পরিবর্তনের পেছনে মূল কৌশলটি ছিল উত্তর কোরিয়ার পরমাণু হুমকির সঙ্গে নিজস্ব জাতির মানুষকে ধ্বংস করার বৈপরিত্য বা বিরোধ দূর করা। অতীতে যাদের সহোদর বা এক জাতির লোক বলা হতো, তাদের ওপর পারমাণবিক হামলা চালানোর যে হুমকি পিয়ংইয়ং দিচ্ছিল, দক্ষিণ কোরিয়াকে পৃথক শত্রু রাষ্ট্র ঘোষণা করার মাধ্যমে সেই আদর্শগত বিভ্রান্তি দূর হয়। তাছাড়া, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়া এবং রাশিয়ার সাথে কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা বাড়ার ফলে উত্তর কোরিয়া এখন বিশ্বমঞ্চে একটি স্বীকৃত পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান পোক্ত করার পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়েছে। এই সীমান্ত নির্মাণকাজের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার তিনটি প্রধান লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে: প্রথমত, নিজ দেশের নাগরিকদের উত্তর কোরিয়া ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া রোধ করা; দ্বিতীয়ত, কোনো সম্ভাব্য যুদ্ধের সময় দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর যেকোনো অগ্রযাত্রাকে ধীরগতির করে দেওয়া এবং তৃতীয়ত, সীমান্ত এলাকাটিকে একটি আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে দৃশ্যমান রূপ দেওয়া।

যদিও কিম জং-উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো-জং দাবি করেছেন যে, সীমানা চিহ্নিত ও সুরক্ষিত করার মাধ্যমে সীমান্ত সংঘাতের ঝুঁকি কমে যাবে, তবে সামরিক বিশ্লেষকরা ভিন্ন মতামত দিচ্ছেন। তাদের মতে, সীমান্তজুড়ে নতুন আর্টিলারি এবং ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট মোতায়েন করার ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ভুল থেকে ছোটখাটো সংঘাতও বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মাঝে উত্তেজনা আরও চরমে ওঠার পেছনে সরাসরি বেশ কিছু ঘটনা জড়িত। ২১ সেপ্টেম্বর ডিএমজেড এলাকার ভেতরে একটি পথ পরিষ্কার করার সময় ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিনজন সৈন্য আহত হন, যার মধ্যে একজন সেনা সদস্যের একটি পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দক্ষিণ কোরিয়া সেনাবাহিনীর তদন্তের পর জানায় যে, উত্তর কোরিয়া আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করে দক্ষিণ অংশের দিকে এই মাইন স্থাপন করেছিল এবং তারা এর জন্য পিয়ংইয়ংয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানায়। উত্তর কোরিয়া অবশ্য সম্পূর্ণ ঘটনাটি অস্বীকার করে এটিকে একটি সাজানো নাটক বলে আখ্যা দিয়েছে।

অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী আরও অভিযোগ করেছে যে, প্রাচীর নির্মাণের সময় উত্তর কোরিয়ার সৈন্যরা একাধিকবার আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে তাদের অঞ্চলে ঢুকে পড়েছে, যার জবাবে দক্ষিণ কোরিয়া ফাঁকা গুলি বা সতর্কতামূলক গুলি ছুড়তে বাধ্য হয়। উত্তর কোরিয়া অবশ্য এসব সতর্কতামূলক গুলিকে সশস্ত্র দুষ্কৃতীদের উসকানিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিম ইয়ো-জং মাত্র এক মাসেরও কম সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার তীব্র সমালোচনা করে প্রায় ১০টি বিবৃতি দিয়েছেন, যা অত্যন্ত অস্বাভাবিক বলে মনে করছে সিউলের একীকরণ মন্ত্রণালয়। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, সীমান্তে দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে প্রচারণা চালানোর জন্য তাদের লাউডস্পিকারগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং কয়েক দিনের মধ্যেই সেগুলো চালু হবে।

সীমান্তে ঘটে যাওয়া এসব অনুপ্রবেশ ও উত্তেজনার আড়ালে মূল একটি সংকট কাজ করছে তা হলো, প্রকৃত সীমান্ত বা মিলিটারি ডিমার্কেশন লাইন (এমডিএল) আসলে ঠিক কোথায়, তা উভয় পক্ষের স্পষ্টভাবে না জানা। ১৯৫৩ সালের অস্ত্রবিরতি চুক্তির সময় ১:৫০,০০০ স্কেলের একটি মানচিত্রে সীমান্তরেখা আঁকা হয়েছিল, যেখানে স্কেলের মাত্র এক মিলিমিটার চওড়া রেখা মানে বাস্তবে প্রায় ৫০ মিটার জমি। মানচিত্রের সেই রেখা ধরে ১২৯২টি নম্বরযুক্ত মার্কার বা খুঁটি বসানো হয়েছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এবং যত্নের অভাবে বর্তমানে তার মাত্র ২০০টির মতো খুঁটি দৃশ্যমান রয়েছে। ফলে প্রতিটি পক্ষ এখন যার যার নিজস্ব পদ্ধতিতে এই সীমান্তরেখা হিসেব করে থাকে। সিউল তাদের মানচিত্র তৈরি করেছে মার্কিন ন্যাশনাল জিওস্পেশিয়াল-ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির ডেটা ব্যবহার করে, আবার অস্ত্রবিরতি তদারকি করা মার্কিন নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘ কমান্ড (ইউএনসি) এক দশক আগে চালানো নিজেদের জরিপের ওপর ভিত্তি করে সীমান্ত চিহ্নিত করে। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া কেবল যেকটি পুরনো খুঁটি দেখা যায়, সেগুলোকে সোজা রেখায় যুক্ত করে তাদের সীমানা মেনে চলছে বলে ধারণা করা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পরীক্ষা করে দেখেছে যে, তাদের টানা রেখা এবং জাতিসংঘ কমান্ডের টানা রেখার মধ্যেই প্রায় ৬০ শতাংশ পয়েন্টে ফারাক রয়েছে এবং অনেক জায়গায় এই পার্থক্যের পরিমাণ প্রায় কয়েকশো মিটার। উত্তর কোরিয়া এই সীমান্তরেখাকে ঠিক কীভাবে হিসাব করে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ফলস্বরূপ সীমান্ত পারাপারের ঘটনা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কেবল আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসেই উত্তর কোরিয়ার সেনারা প্রায় ৫০ বার আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করেছে।

বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সীমান্ত সংকট দূর করার জন্য সিউল প্রশাসনের দিক থেকে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মিলিটারি ডিমার্কেশন লাইন বা সীমান্তরেখাটি ঠিক কোথায় সেটির যৌথ সমীক্ষা করা, ২০২৩ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া দুই দেশের সামরিক যোগাযোগ চ্যানেলগুলো পুনরায় চালু করা এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক সংঘর্ষ এড়ানোর উপায় বের করতে দক্ষিণ কোরিয়া নতুন করে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। গত এক বছরের মধ্যে এটি সিউলের দ্বিতীয় প্রস্তাব হলেও উত্তর কোরিয়া পূর্বের মতো এটিও সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে চলেছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় উত্তর কোরিয়ার এই স্থায়ী প্রাচীর নির্মাণকাজকে অস্ত্রবিরতি চুক্তির চরম লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে। তবে জাতিসংঘ কমান্ড বিষয়টিকে কিছুটা ভিন্নভাবে দেখছে। তাদের মতে, সীমান্ত এলাকায় নতুন স্থাপনা বা সামরিক সীমানা তৈরি করলেই সরাসরি অস্ত্রবিরতি চুক্তি ভঙ্গ হয় না বরং প্রতিটি নির্মাণের বৈশিষ্ট্য ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পৃথকভাবে বিচার করতে হবে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us