ছবি: সংগৃহীত
বেশির ভাগ জনমত জরিপ যেমনটি বলছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল রিপাবলিকানদের বিপক্ষে গেলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফলাফল মানবেন তো? মিলিয়ন ডলারের এই প্রশ্নটি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে করা হয়েছিল। অন্য কোনো আধুনিক প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে এটি হয়তো কোনো প্রশ্নই হতো না। কিন্তু ট্রাম্প তো আর সবার মতো না।
মঙ্গলবার এই প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি মেনে নেব, যদি সেগুলো সততার সঙ্গে হওয়া নির্বাচন হয়, হ্যাঁ।’ অতীতের আচরণের কারণে ট্রাম্পের এই শর্তযুক্ত উত্তর অনেককেই শঙ্কিত করেছে। শঙ্কার সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগেরও অনেক কারণ রয়েছে। কারণ, ট্রাম্প নিজেকে একটি নির্বাচনের সততা যাচাইয়ের একমাত্র রেফারি হিসেবে উপস্থাপন করেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইঙ্গিত দেন যে তিনি নির্বাচনের ফলাফল না-ও মেনে নিতে পারেন, তখন তা আসলে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত। রিপাবলিকান পার্টির নেতা হিসেবে এখন তার পঞ্চম জাতীয় নির্বাচনে এসে ট্রাম্পের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত কার্যপদ্ধতি তৈরি হয়েছে। তিনি যেকোনো নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকেই ভোটিং ব্যবস্থা এবং নির্বাচন কর্মকর্তাদের সততা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেন এবং ডেমোক্র্যাটরা কারচুপি করতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন। এরপর তিনি নিজের তৈরি করা এই অবিশ্বাসের আবর্তকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন এবং ভোট গণনার আগেই ইঙ্গিত দেন যে নির্বাচনটি সুষ্ঠু না-ও হতে পারে।
মধবর্তী নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে, এবারের পরিস্থিতিটিও যেন বারবার ফিরে আসা একটি চেনা নাটকের মতো মনে হচ্ছে। ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যখন তিনি হেরেছিলেন, তখন একাধিক রিপাবলিকান কর্মকর্তা, আদালত এবং এমনকি তার নিজস্ব বিচার বিভাগ কোনো অনিয়ম না পাওয়ার প্রমাণ দেওয়া সত্ত্বেও তিনি জালিয়াতির দাবি করেছিলেন।
নির্বাচন নিয়ে ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি একটি হুমকিস্বরূপ প্রেক্ষাপটে এসেছে। তিনি টেক্সাস এবং অন্যান্য অঙ্গরাজ্যগুলোতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের সীমানা নির্ধারণ পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা চালিয়ে এবং ভোটারদের নিবন্ধন ও আইডি সংক্রান্ত একটি আইন পাস করার জন্য কংগ্রেসের ওপর ব্যর্থ চাপ প্রয়োগ করে এই বছরের বেশির ভাগ সময় মধ্যবর্তী নির্বাচনকে রিপাবলিকানদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সমালোচকদের মতে, এই আইন পাস হলে লাখ লাখ নাগরিক ভোটাধিকার হারাতেন।
তা ছাড়া সংবিধানে প্রেসিডেন্টকে অঙ্গরাজ্যগুলোর নির্বাচন পরিচালনার কোনো ক্ষমতা না দিলেও তিনি সম্প্রতি বিচার বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন আলাস্কার ইউএস সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভান হেরে গেলে সেই ফলাফল প্রত্যয়ন আটকে দিতে মামলা করা হয়। ট্রাম্প জোর দিয়ে বলছেন যে, ড্যানিয়েল জে. সুলিভান নামের একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারেন এবং তার এই প্রার্থিতা একটি ডেমোক্র্যাটিক চক্রান্ত। যদিও আলাস্কার সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন যে দ্বিতীয় সুলিভান আইনগতভাবেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন।
আরেকটি আগাম পদক্ষেপে বিচার বিভাগ গত শুক্রবার ক্যালিফোর্নিয়াকে ভোটার তালিকা থেকে সন্দেহভাজন অ-নাগরিকদের চিহ্নিত করার এবং তাদের ডাকযোগের ব্যালটগুলো আলাদা রাখার নির্দেশ দিয়েছে; পাশাপাশি সতর্ক করেছে যে যেসব কর্মকর্তা জেনেবুঝে অ-নাগরিকদের ভোট গণনা করবেন, তারা ফৌজদারি দায়বদ্ধতার মুখোমুখি হতে পারেন। একটি ফেডারেল আপিল আদালত বিচার বিভাগের সেই চালটি আটকে দিয়েছে।
আলাস্কায় ডেমোক্র্যাটিক প্রতিদ্বন্দ্বী মেরি পেলটোলা নির্বাচনের আগেই বিচার বিভাগের এই পদক্ষেপটি বাতিল করার জন্য একজন বিচারকের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। তবে প্রশাসনের এই চালচলন নির্বাচন-পরবর্তী একটি মুখোমুখি সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং ২০২০ সালের তুলনায় পরিস্থিতি ভিন্ন; সে সময় তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল বিল বার ট্রাম্পের ব্যাপক নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কিন্তু এবার বিচার বিভাগ তার বিরোধিতা করবে এমন সম্ভাবনা কম বলেই মনে হচ্ছে।
আমেরিকান ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার দিন—৬ জানুয়ারি, ২০২১-এর ক্ষতগুলোর কারণে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নির্বাচনী চালচলন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেনের কাছে হেরে যাওয়ার পর ট্রাম্পের সমর্থকরা ক্যাপিটল হিলে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছিল এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের মারধর করেছিল। এর কয়েক মাস আগে থেকেই ট্রাম্প ঠিক মঙ্গলবারের মতোই একই ভাষা ব্যবহার করে সেই নির্বাচন নিয়ে তাদের আস্থা বিষাক্ত করে তুলছিলেন।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে জো বাইডেনের বিরুদ্ধে তার প্রথম প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি আশা করি এটি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। যদি এটি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়; আমি ১০০ ভাগ সঙ্গে আছি। কিন্তু আমি যদি দেখি হাজার হাজার ব্যালট নিয়ে কারচুপি করা হচ্ছে, তবে আমি তা মেনে নিতে পারি না।’
চার বছর পর, ২০২৪ সালের সিএনএন প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কে যখন ডানা ব্যাশ ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে তিনি কে জিতল তা বিবেচনা না করেই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবেন কি না, তখন তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘যদি এটি একটি সুষ্ঠু, আইনি এবং ভালো নির্বাচন হয়—অবশ্যই।’ ২০২৪ সালের ফলাফলের বিরোধিতা ট্রাম্প করেননি। এর কারণ স্পষ্ট, তিনি জিতেছিলেন। চার বছর আগে তিনি হেরেছিলেন।
কোনো ব্যাপক নির্বাচনী জালিয়াতির প্রমাণ ছাড়াই ট্রাম্পের এই ধারাবাহিক নির্বাচন প্রত্যাখ্যানের মানসিকতা এই প্রশ্ন তোলে যে—কেন তিনি অন্য সব প্রেসিডেন্টের মধ্যে ব্যতিক্রম হয়ে এই গণতান্ত্রিক বাস্তবতা মেনে নিতে পারেন না যে নির্বাচনে কখনো কখনো হারতেও হয়? এর একটি উত্তর হলো, ট্রাম্প প্রচুর প্রমাণ দিয়েছেন যে তিনি ভোটারদের নেতা বাছাইয়ের নীতির চেয়ে ক্ষমতাকে বেশি পরোয়া করেন। আরেকটি উত্তর হলো, ট্রাম্প নিজের একটি ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড তৈরি করেছেন জীবনের অন্যতম ‘সেরা বিজয়ী’ হিসেবে। এই ভঙ্গুর অহংবোধ নিজেকে ‘পরাজিত’ হিসেবে দেখার মানসিকতার সঙ্গে একেবারেই মেলে না—আর এটিই একটি কারণ যে তিনি এখনো বাইডেনের কাছে ২০২০ সালের পরাজয় স্বীকার করতে পারেন না।
২০২০ সালে আমেরিকার আইনি এবং সাংবিধানিক রক্ষাকবচগুলো দৃঢ় ছিল। কিন্তু ট্রাম্প এখন এমন উপদেষ্টাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত নন যারা তার সবচেয়ে অগণতান্ত্রিক প্রবণতাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে প্রস্তুত থাকবেন। তারপরও ডেমোক্র্যাট এবং উভয় দলের অঙ্গরাজ্য কর্মকর্তারা যারা নির্বাচন পরিচালনা করেন, তারা হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা এবং স্থানীয় ট্রাম্প সমর্থকদের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার জন্য কয়েক মাস ধরে প্রস্তুতি নিয়েছেন।
ডেমোক্র্যাটরা যদি বড় ব্যবধানে জয়ী হয়, তবে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ কম হতে পারে। যদি ফলাফল খুব হাড্ডাহাড্ডি হয়, তবে দীর্ঘস্থায়ী আইনি লড়াইয়ের কারণে সিনেটের ভাগ্য সপ্তাহের পর সপ্তাহ ঝুলে থাকতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সম্ভাব্য হাউস স্পিকার হাকিম জেফ্রিজ গত সপ্তাহে সিএনএনকে বলেছিলেন, ‘তিনি ধরে নিচ্ছেন রিপাবলিকানরা নভেম্বরের নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া থেকে আটকাতে যেকোনো ধরনের শয়তানি পরিকল্পনা করার চেষ্টা করবে।’
প্রতিকূল নির্বাচনী ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য ট্রাম্পের কাছে শক্তিশালী প্রণোদনা থাকতে পারে, কারণ ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যেই হোয়াইট হাউস, মন্ত্রিসভা এবং ট্রাম্প পরিবারের আর্থিক লেনদেন নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন তদন্তের পরিকল্পনা করছে। কিন্তু ৩০-এর ঘরে থাকা জনপ্রিয়তার হার নিয়ে মেয়াদের শেষে থাকা একজন প্রেসিডেন্ট, যিনি মাত্রই একটি বড় জাতীয় নির্বাচনে হেরেছেন, তার কি তা সফল করার মতো রাজনৈতিক শক্তি থাকবে? তা ছাড়া, ট্রাম্পের আত্মকেন্দ্রিক নির্বাচনী প্রচারণার ভঙ্গি ইঙ্গিত দেয় যে তিনি ঝুঁকিতে থাকা রিপাবলিকানদের নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন। ব্যালটে যখন তার নিজের নাম থাকে না, তখন তিনি হয়তো বিষয়টিকে কম গুরুত্ব দেন।
গত মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট অন্তত ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসের সঙ্গে একটি তিক্ত সহাবস্থানের সময়কালের কথা চিন্তা করছেন বলে মনে হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘দেখুন, আমার একটি শক্তিশালী ভেটো ক্ষমতা আছে। আমি আশা করি তেমনটা হবে না, তবে যদি হয়, তবে তা এর আগে অনেক প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রেই ঘটেছে।’
কিন্তু ট্রাম্প প্রায়ই তার হুমকিগুলো কার্যকর করেন এবং নির্বাচন নিয়ে তার সাম্প্রতিক শর্তারোপ দেখায় যে তিনি এখনো মনে করেন যে নির্বাচনে তিনি হারবেন, তা অবশ্যই অন্যায্য হতে হবে।
সূত্র: সিএনএন