ছবি: সংগৃহীত
আমেরিকায় নির্ধারিত একটি চালানে মারাত্মক বিভ্রান্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-৩৫ স্টিলথ ফাইটার জেট প্রোগ্রামের কিছু গুরুত্বপূর্ণ খুচরা যন্ত্রাংশ নিখোঁজ হয়ে গেছে। এই ঘটনায় অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথভাবে তদন্ত শুরু করার কথা নিশ্চিত করেছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর কথা থাকলেও যন্ত্রাংশ ভর্তি এই বিমানটির চালান ভুলবশত হংকংয়ে পৌঁছায় এবং এর পর থেকেই যন্ত্রাংশগুলোর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস নিশ্চিত করেছেন যে চলতি বছরের শুরুর দিকে ঘটে যাওয়া এই অপ্রত্যাশিত ঘটনার তদন্তে ক্যানবেরা মার্কিন প্রশাসন ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। অস্ট্রেলিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত পাঠানোর কথা ছিল এফ-৩৫-এর কিছু অব্যবহারযোগ্য বা মেরামতযোগ্য পার্টস। কিন্তু লকহিড মার্টিনের পক্ষে তৃতীয় পক্ষের একটি পরিবহন কোম্পানি পণ্যগুলো বহন করার সময় একটি বড় ধরনের ভুল করে এবং চালানটি দুর্ঘটনাবশত হংকংয়ে পাঠিয়ে দেয়। ঘটনাটির কয়েক মাস পার হয়ে গেলেও নিখোঁজ যন্ত্রাংশগুলোর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। বার্তা সংস্থা পলিটিকো গত সপ্তাহে প্রথম এই বিভ্রান্তির খবরটি প্রকাশ করে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জানান, ক্যানবেরা এই আন্তর্জাতিক তদন্তে সহায়তা করছে। তবে তিনি এটিও বলেন যে নিখোঁজ হওয়া উপাদানগুলো কোনো গোপনীয় বা সংবেদনশীল প্রযুক্তির অংশ ছিল না। তবে ঠিক কী কারণে বা কিসের ভিত্তিতে এই উপাদানগুলোকে ‘অসংবেদনশীল’ বলে দাবি করা হচ্ছে; সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেননি মার্লেস। তিনি উল্টো জানান যে, এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য অনুসন্ধানকারীদের যুক্তরাষ্ট্র ও প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিনের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা উচিত। অন্যদিকে পলিটিকোর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সেই নিখোঁজ চালানের ভেতরে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের ক্যানোপি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এটি মূলত রাডার-প্রতিরোধী প্রযুক্তিতে তৈরি। তবে শেষ পর্যন্ত ক্যানোপির কোন অংশগুলো এতে জড়িত ছিল তা এখনো স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এফ-৩৫ হলো একটি পঞ্চম প্রজন্মের অত্যাধুনিক স্টিলথ ফাইটার জেট। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অন্তত ১২টি দেশ নিজস্ব ভূখণ্ডের সামরিক ঘাঁটি থেকে এই যুদ্ধবিমান পরিচালনা করে আসছে। পুরো ঘটনাটি মার্কিন সামরিক মহলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। পেন্টাগনের ‘এফ-৩৫ জয়েন্ট প্রোগ্রাম অফিস’ সংবাদমাধ্যমের কাছে একটি বিবৃতিতে স্বীকার করেছে যে অব্যবহারযোগ্য উপাদান পরিবহন সংক্রান্ত একটি চালানজনিত বড় সমস্যা হয়েছে। তারা এসব অংশ পুনরুদ্ধার করতে মার্কিন কর্তৃপক্ষ এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারদের সাথে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সশস্ত্র সেবা সংক্রান্ত কমিটিও বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। পাশাপাশি পেন্টাগন ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা গত জুন মাস থেকেই মার্কিন কংগ্রেসের কর্মীদের এই স্পর্শকাতর পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত ব্রিফিং দিয়ে আসছেন।
এই নজিরবিহীন ঘটনাটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের বিশাল এবং বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতার দুর্বলতাকে উন্মোচিত করেছে। মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী তাদের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি, আঞ্চলিক গুদাম এবং মেরামত সুবিধার মধ্যে নিয়মিতভাবে এসব যন্ত্রাংশ আন্তর্জাতিকভাবে লেনদেন করে থাকে। আর এই বিশাল নেটওয়ার্কের একটি সিংহভাগ পেন্টাগনের পক্ষ থেকে তদারকি করে বিমানটির মূল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহীড মার্টিন। তাছাড়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এসব সামগ্রী পরিবহনের কাজে বহু বাণিজ্যিক পরিবহন সংস্থা ও অন্যান্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকেও নিযুক্ত করা হয়।
তবে এফ-৩৫ প্রোগ্রামের যন্ত্রাংশ গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগেও বহুবার এমন ঘটনা ঘটেছে। মে ২০২৩-এ প্রকাশিত মার্কিন সরকারের জবাবদিহিতা সংক্রান্ত দপ্তর (জিএও)-এর একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদনে জানানো হয় যে, মে ২০১৮ থেকে পরবর্তীতে সময়গুলোর মধ্যে এফ-৩৫ প্রোগ্রামের অন্যতম প্রধান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে ৮৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের ১ মিলিয়নেরও বেশি স্পেয়ার পার্টস হারিয়ে গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিংবা ধ্বংস হয়ে গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো পেন্টাগনের এফ-৩৫ জয়েন্ট প্রোগ্রাম অফিস এসব বিপুল পরিমাণ নিখোঁজ হওয়া কেসের মধ্যে ২ শতাংশেরও কম ঘটনা পর্যালোচনা করতে সক্ষম হয়েছিল। জিএও এর তদন্তে উঠে আসে যে, আন্তর্জাতিক এই ঠিকাদার-পরিচালিত পুলটিতে রাখা পার্টসগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান, সংখ্যা এবং আর্থিক মূল্য পর্যবেক্ষণ করার মতো কোনো সমন্বিত ও শক্তিশালী নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে ছিল না।
মূলত বিশ্বব্যাপী এই বিশাল সরবরাহ ব্যবস্থার মারাত্মক গোলোযোগ এবং অব্যবস্থাই পেন্টাগনের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই আধুনিক অস্ত্র কর্মসূচিকে বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে। বছরের পর বছর ধরে মার্কিন এয়ারফোর্সের এই স্বপ্নদর্শী এফ-৩৫ প্রকল্পটি অতিরিক্ত ব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ জটিলতা, যন্ত্রাংশের তীব্র সংকট, নিয়মিত প্রযুক্তিগত আপডেট প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা এবং পেন্টাগনের নির্ধারিত প্রস্তুত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে একের পর এক ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়ে আসছে। সূত্র: আরটি