ছবি: সংগৃহীত
প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় যুক্তরাজ্যের গ্লুচেস্টারশায়ারে এক চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এক কিশোরীর ওপর অবসেসড বা আসক্ত হয়ে পড়া ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর তাকে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর একটি দোকানের ভেতর ঢুকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করেছে। কিশোরীর চিৎকার ও জীবন বাঁচানোর আকুতির মধ্যেই তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসা দোকানদারকেও ছুরিকাঘাত করে ওই কিশোর।
ব্রিস্টল ক্রাউন আদালতে সম্প্রতি এই বর্বরোচিত আক্রমণের বিবরণ ও সিসিটিভি ফুটেজ উপস্থাপন করা হলে যুক্তরাজ্যজুড়ে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি হয়।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, অভিযুক্ত কিশোরের বাড়ি উইল্টশায়ারে। গত বছরের ডিসেম্বরে সে ওই কিশোরীকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়, কিন্তু কিশোরী তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। এরপর থেকেই অভিযুক্ত কিশোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে তাকে উত্যক্ত করতে থাকে এবং যোগাযোগ করার জন্য ক্রমাগত চাপ দিতে থাকে। একপর্যায়ে গত ১৫ মার্চ গ্লুচেস্টারশায়ারের সাইরেনসেস্টারের একটি দোকানের সামনে সে আগে থেকেই ওত পেতে থাকে। কিশোরীটি দোকানে প্রবেশ করা মাত্রই জিন্সের পকেটে গোপন করে রাখা ধারালো ছুরি নিয়ে সে-ও পেছনে পেছনে ভেতরে ঢুকে পড়ে।
ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কিশোরটি হুট করে মেয়েটির কাছাকাছি গিয়ে তাকে জাঁকড়ে ধরে এবং পকেট থেকে ছুরি বের করে অতর্কিতে হামলা চালায়। প্রাণ বাঁচাতে কিশোরীটি দোকানের ভেতরের দিকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে কিশোরটি তাকে তাড়া করে কয়েক দফা ছুরিকাঘাত করে। এ সময় দোকানের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসেন এবং কিশোরটিকে টেনে দূরে সরানোর চেষ্টা করেন। তবে খ্যাপাটে কিশোরটি সেই দোকানদারের পিঠেও ছুরি বসিয়ে দেয় এবং আবারও কিশোরীটিকে ধাওয়া করতে থাকে।
একপর্যায়ে গুরুতর আহত অবস্থায় কিশোরীটি কোনোমতে দোকান থেকে বের হয়ে পাশের একটি বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং চিৎকার করে সাহায্য চায়। এই নৃশংস হামলায় তার ঘাড়, মুখ ও হাতে বেশ কয়েকটি গভীর ক্ষত তৈরি হয় এবং পিঠে মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন পড়ে। খবর পেয়ে দুপুর ১১টা ১৫ মিনিটে সাইরেনসেস্টারের আপার চার্নসাইড এলাকায় পুলিশ পৌঁছায়। হামলার পরপরই অভিযুক্ত কিশোর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেলেও নিকটস্থ একটি স্থান থেকে পুলিশ তাকে দ্রুত গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। তল্লাশি চালিয়ে তার জিন্সের পকেট থেকে রক্তমাখা ছুরিটি উদ্ধার করা হয়।
আদালতে উপস্থাপিত এক লিখিত বিবৃতিতে ভুক্তভোগী কিশোরী তার ওপর বয়ে যাওয়া শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার কথা তুলে ধরে। সে জানায়, এই ঘটনার পর থেকে সে গভীর মানসিক ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সে বলে, আমি এখন যেকোনো স্থানে যেতে ভয় পাই এবং চরম আতঙ্কে থাকি। এমনকি কেউ হঠাৎ পাশে হাত তুললেও আমি আঁতকে উঠি, কারণ আমি জানি না সে আমার ওপর কি হামলা করতে যাচ্ছে। ঘটনার আগে আমি কখনোই এমন ছিলাম না। এই ধাক্কা আমি মেনে নিতে পারছি না। কয়েক দিন আমি ঘর থেকেই বের হতে পারিনি। আমি স্বপ্নে বারবার ওই নির্মম আক্রমণের ঘটনাটি দেখি, শুধু স্থানগুলো বদলে যায়। আলো বন্ধ করে ঘুমালেও মনে হয় ঘরের ভেতর কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। আমি কিছুতেই এই স্মৃতি ভুলে থাকতে পারছি না। এখন মানুষকে বিশ্বাস করাও আমার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন আমাকে কেউ কাজের জায়গায় পৌঁছে দিয়ে যায়, কারণ আমি একা বাইরে বের হতে ভয় পাই। নিজের চেনা এলাকায় একজন কিশোরী হিসেবে আমার এমন পরিস্থিতিতে পড়ার কথা ছিল না।
বিচারক ও তদন্তকারী কর্মকর্তারা ঘটনার বর্ণনা শুনে স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। ডিটেকটিভ অফিসার আদালতে জানান, দোকানের কর্মচারীর সাহসিকতার কারণেই বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, আহত হওয়া সত্ত্বেও ওই কর্মী দ্রুত মূল দরজার দিকে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দেন, যাতে ভুক্তভোগী মেয়েটি দ্রুত বাইরে বের হয়ে জীবন বাঁচাতে পারে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ব্রিস্টল ক্রাউন কোর্টে হাজির করা হলে ১৪ বছর বয়সী অভিযুক্ত কিশোরটি ইচ্ছা করে আঘাত করা, গুরুতর শারীরিক ক্ষতিসাধন করা এবং জনসমক্ষে ধারালো অস্ত্র রাখার অপরাধ স্বীকার করে নেয়। পরবর্তীতে গ্লুচেস্টার ক্রাউন কোর্ট তাকে এক বছরের ‘রেফারেল অর্ডার’-এর দণ্ড প্রদান করেন। শুনানি শেষে বিচারক অভিযুক্ত কিশোরটিকে তিন মাস কাস্টডিতে রাখার বিষয়ে কিছুটা বিস্ময় প্রকাশ করে মন্তব্য করেন যে, অপরাধ অত্যন্ত গুরুতর হলেও অপ্রাপ্তবয়স্কদের মামলার ক্ষেত্রে এতদিন হেফাজতে রাখার বিষয়টি সাধারণত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে কিছুটা সামঞ্জস্যহীন।
সূত্র: বিবিসি, এনডিটিভি