ছবি: সংগৃহীত
ফাইজুস সালেহীন :প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৭ অক্টোবর রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি কোয়ার্টার ও ফুটপাতসহ মোট ১৩টি স্পট আকস্মিক পরিদর্শন করেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক পরিচ্ছন্নতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে তিনি এই ঝটিকা সফর করেন।
প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের আকস্মিক পরিদর্শন নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক। আমাদের দেশে আনাচকানাচে সমস্যার অন্ত নেই। অপরিচ্ছন্নতা একটি বড় সমস্যা। ডেঙ্গু ভয়াবহরূপ পরিগ্রহ করেছে। সরকারি হিসাবে গত কয়েক সপ্তাহে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে শতাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ডেঙ্গু সংক্রমণের প্রধান কারণ অপরিচ্ছন্নতা। হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি আবাসিক এলাকা, রাস্তাঘাট সর্বত্রই পরিচ্ছন্নতার অভাব। এই অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ-প্রতিবেশের জন্য দায়ী কে? এজন্য এককভাবে কাউকে বা কোনো একটি শ্রেণিকে দোষারোপ করা যায় না। এজন্য দায়ী আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে যে বার্তাটি পাওয়া যায়, সেটি হলো সরকার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে সচেষ্ট। বিষয়টি নাগরিক সচেতনতা তৈরি করবে আশা করা যায়।
প্রধানমন্ত্রী যখন বিভিন্ন স্পট পরিদর্শন করেন তখন মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে বিতর্কের জন্ম দেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তিনি গত শনিবার গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনের কাছে ঘুণ্টিঘর এলাকায় পিস্তল উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে যান। ধাওয়া করে কয়েকজনকে পাকড়াও করেন। মাদকবিরোধী অভিযানে কারও কোনো আপত্তি না থাকলেও সংসদ সদস্য এবং সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ হলে দেখা দেয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সরকারের জন্য বিষয়টি ছিল বিব্রতকর। এমন পরিস্থিতিতে গত সোমবার ইশরাক হোসেন পদত্যাগ করেন। বাস্তবতা হলো, মাদক ইতোমধ্যে ভয়াবহ সামাজিক সংকট তৈরি করেছে। শহর, গ্রাম সর্বত্র মাদক তার ধ্বংসাত্মক ছোবল হেনে চলেছে। মাদকের চালান অবাধে পৌঁছে যাচ্ছে গ্রাম-গ্রামান্তরে। বিভিন্ন সময়ে পুলিশ মাদকসেবীদের ধরে কোর্টে চালান দিলেও মাদক কারবারিরা বেশির ভাগ সময় থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। বাংলাদেশে মাদকের ছোবল আজ আর কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই সংকটের গভীরতার যে চিত্রটি পাওয়া যায়, তা ভয়াবহ। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১৩ জেলা ও ২৬ উপজেলায় ৫ হাজার ২৮০ জনের ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো মাদক ব্যবহার করছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। অন্য এক প্রতিবেদনে এই সংখ্যা ৮৩ লাখ বলা হয়েছে। মাদকাসক্তদের প্রায় ৩৩ শতাংশ ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সি। অর্থাৎ কিশোর বয়সেই অনেকে মাদকের সংস্পর্শে আসছে। মাদকাসক্তদের মাত্র ১৩ শতাংশ চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা পাচ্ছে, বাকি ৮৭ শতাংশই থাকছে সেবার বাইরে। মাদকাসক্তদের মধ্যে যেমন রয়েছে তরুণ, তেমনই অনেক চাকরিজীবী, পেশাজীবী, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবারকর্তা পর্যন্ত মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। কোনো পরিবারের একজন সদস্যও যদি মাদকের নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে সেই পরিবারে শান্তি বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। সেই পরিবার শিকার হয় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের। মাদকদ্রব্যের সরবরাহ ও প্রাপ্যতা বন্ধ না করে শুধু মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। যারা ইতোমধ্যে আসক্ত হয়ে পড়েছে তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু এটা একমাত্র সমাধান নয়।
মাদকের ছোবল ও বেহাল হাসপাতালমাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ২০২৫ সালে ৪ কোটি ৩৬ লাখ ইয়াবা ও অন্যান্য অ্যামফিটামিন-জাতীয় ট্যাবলেট জব্দ করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৯১ শতাংশ বেশি। ধারণা করা হয়, দেশে যত মাদক ঢোকে তার মাত্র ১০ শতাংশ ধরা পড়ে। বাকি ৯০ শতাংশ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সারা দেশে। বিভিন্ন সময়ে পুলিশ অভিযান চালিয়ে মাদকসেবীদের আটক করে। কিন্তু যারা মাদক বিক্রি করে তারা নিরাপদে থেকে যায়। আর রাঘববোয়ালদের টিকিটিও স্পর্শ করা হয় না। এর ফলে দেশে নতুন নতুন মাদকের বিস্তার ঘটে চলেছে বিনা বাধায়। ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজার পাশাপাশি ক্রিস্টাল মেথ (আইস), এলএসডি, ডিওবি-এর মতো সিনথেটিক ও সেমি-সিনথেটিক মাদকের আবির্ভাব সমস্যাকে আরও ঘনীভূত করে চলেছে বলে লেখালেখি হচ্ছে।
বাংলাদেশে মাদক উৎপাদন হয় না। তা না হলেও ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
জানা যায়, মিয়ানমারের শান প্রদেশ বিশ্বের বৃহৎ ইয়াবা উৎপাদনকারী অঞ্চল। সেখান থেকে নাফ নদ ও দুর্গম সীমান্ত পেরিয়ে টেকনাফ-কক্সবাজার হয়ে ইয়াবা ঢুকছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বার্ষিক ড্রাগ রিপোর্ট বাংলাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী, প্রধানত তিনটি করিডর দিয়ে ফেনসিডিল, ক্রিস্টাল মেথ ও গাঁজা প্রবেশ করছে। ২০২৪ সালে প্রায় ১৩০ কেজি কোকেন জব্দ করা হয়েছে বাংলাদেশে, ২০২৫ সালেও ১৪ দশমিক ৬ কেজি জব্দ হয়েছে, যা প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে।
সামাজিক ও পারিবারিক অপরাধের ৫০ শতাংশ মাদকের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং শতকরা ৬৫ ভাগ যৌন নির্যাতনের ঘটনা মাদক অপব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত বলে এক গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ বিপথগামী হচ্ছে, কিশোর-কিশোরীরাও আসক্ত হচ্ছে। মাদকের অবৈধ অর্থনীতির আকার এখন বেশ বড়। কর্মক্ষম যুবসমাজ অকেজো হয়ে পড়ছে। চিন্তার জগতে বন্ধ্যত্ব সৃষ্টি করছে, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ধ্বংস হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ। দেশে মাদকের প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে বাধ্য। কিন্তু নানা কারণে সেটা হয়তো পুরোপুরি সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারীদের সঙ্গে দেশীয় চক্রের যোগসাজশ রয়েছে। কিন্তু তারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই বাস্তবতায় দেশের অভ্যন্তরে, গ্রাম ও শহরে মাদক কারবারিদের যে নেটওয়ার্ক রয়েছে, সেটা চিহ্নিত করে বিকল করার পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। রাজধানীসহ সারা দেশে গ্রামগঞ্জের যে স্পটগুলোতে অবাধে মাদকদ্রব্য বিক্রি হয়, সেই জায়গাগুলো সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে কোনো তথ্য নেই, এমনটি বিশ্বাস করা কঠিন। সেই স্পটগুলোতে নিয়মিত পুলিশি নজরদারি প্রয়োজন। মাদকের গডফাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন।
দুই. ১৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী যে ১৩টি স্পট আকস্মিক পরিদর্শন করেন তার মধ্যে ছিল দুটি সরকারি হাসপাতাল। হাসপাতাল দুটির অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এবং পরিবেশ উন্নয়নের জন্য সময় বেঁধে দেন। সরকারি হাসপাতালের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একটি প্রধান সমস্যা হলো অপরিচ্ছন্নতা। এটি অব্যবস্থাপনার সাক্ষ্য বহন করে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কর্মীর অভাব নেই। অভাব জবাবদিহির। ওয়াশরুমের দরজা আছে তো সিটকিনি নেই, কমোডের বেহাল, কলে পানি নেই, ময়লায়ভরা বেসিন। পানির কল আছে তো কলের মাথা নেই। সরকারি হাসপাতালের এসব সমস্যা নিয়ে কেউ কোনো কথাও বলে না। যেন গা সওয়া হয়ে গেছে।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালগুলোতে সার্জারির জন্য সুই, গজ-ব্যান্ডেজ, গ্লাভস, তুলা এবং প্রয়োজনীয় খুচরা উপকরণ সবই রোগীকে কিনে দিতে হয়। প্রয়োজনীয় ওষুধপথ্যের ব্যয় সব রোগীই বহন করে। হাসপাতালে ডায়াবেটিস রোগীদের গ্লুকোজ মাপার যে ডায়ামিটার-এটাও নিজের থাকতে হবে। অথচ এগুলো হাসপাতালেই থাকার কথা। সরকারি হাসপাতালে ওষুধ বিনা মূল্যে দেওয়ার কথা। দেওয়া হয় না। কেন দেওয়া হয় না-এরও জবাবদিহি নেই।
উপজেলা হাসপাতাল ছাড়াও সারা দেশে সাধারণ সরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৩২টি। বিশেষায়িত হাসপাতালের সংখ্যা ২১টি। এর মধ্যে বেশির ভাগের অবস্থান ঢাকায়। সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিভিন্ন পরীক্ষার ব্যয় তুলনামূলক কম। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করতে পারা মহা সৌভাগ্যের ব্যাপার। অ্যানডোসকোপি, সিটি স্ক্যান বা এমআরআই করতে গেলে কখনো কখনো এক মাসও অপেক্ষা করতে হয়। তত দিনে রোগীর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হওয়া বিচিত্র নয়।
বাংলাদেশে গড়ে প্রতিটি পরিবারের চিকিৎসা খাতে মাসিক ব্যয় সাড়ে তিন হাজার টাকা। এটা মোট মাসিক বাজেটের ১১ শতাংশ। চিকিৎসা খাতে এই ব্যয়ের সিংহ ভাগই যায় ওষুধ ও পরীক্ষানিরীক্ষা খাতে। সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষের চিকিৎসা খাতে এই ব্যয় যে কতটা দুর্বহ তা অনুমান করা কঠিন নয়।
সরকারি হাসপাতালগুলো যদি ঠিকঠাক সেবা দিত তাহলে মাথাপিছু চিকিৎসা ব্যয় বহুলাংশে কমে আসতে পারত। এমতাবস্থায় সরকারি হাসপাতালগুলোর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন জরুরি। প্রতিটি ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যকীয়।
♦ লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক।
সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন