ছবি: সংগৃহীত
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : তা খুনাখুনি বেশ চলছে। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের মধ্যে তো বটেই, সরকারবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর মধ্যেও কম নয়। এসব খুনাখুনিকে কী বলব? রাজনীতি? তা বলা যাবে। কেননা, রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যেই ঘটনাটা ঘটছে, প্রত্যেকেরই একটা রাজনৈতিক পরিচয় রয়ে গেছে। লড়াইটা আগে বাইরে ছিল। ছাত্রদলে, ছাত্রলীগে, ছাত্রশিবির অন্য দলে; এখন ভিতরেই চলে এসেছে। আগেও দলের ভিতর কোন্দল ছিল, খুনাখুনিও ছিল। এখন বেড়েছে। কিন্তু আসল ঘটনা মোটেই রাজনৈতিক নয়। আসল ঘটনা দখলের সংগ্রাম। রাজনৈতিক দলের নামে ঘটছে, দলের ভিতরে ঘটছে, কিন্তু যা ঘটছে, তা হলো-কে কোনটা দখল করবে, তার লড়াই। সংক্ষেপে বলতে গেলে লুটপাটের সংগ্রাম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক দলের নামে দুর্বৃত্তরা চাঁদা তোলা, তার ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে তাদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ঝগড়া-ফ্যাসাদ এবং পরিণাম দাঁড়াত হত্যাকাণ্ড। রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করলে চাঁদা তোলায় সুবিধা, নইলে কী জন্য চাঁদা চাইছে বলবে? কোন জোরে চাইবে? আমাদের দলের অনেক কাজ, সম্মেলন, সভা, মিছিল, এসব আছে, দিবস রয়েছে, এমনকি কর্মী মারা গেছে, তাকে দেশে পাঠাতে হবে, এসব কথা বলে চাঁদা চাওয়া যায়। যাদের কাছে চাওয়া হয় তারাও বোঝে পেছনে দল আছে; না দিলে বিপদ হবে। কিন্তু যারা চাঁদা তুলছে, তাদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারায় বিরোধ বাধে। খুনাখুনি হয়। ঢাকা মহানগরী উত্তরে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিএনপি ও যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত হয়েছে। হামলা ও ভাঙচুরে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এক মহিলা এমপি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।
রাজনীতির নামে ঘটছে, কিন্তু মোটেই রাজনীতি নয়। বেচারা রাজনীতি, তার বরঞ্চ ক্ষতিই হচ্ছে। লোকে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ছে রাজনীতিকদের ওপর, এমনকি রাজনীতির ওপরই। এটা খুবই ক্ষতিকর ব্যাপার। রাষ্ট্র আছে, তাই রাজনীতি থাকবেই; কিন্তু লোকে যদি রাজনীতিকদের ওপর আস্থা হারায়, তাহলে অরাজনৈতিকরা ক্ষমতা নিয়ে নেবে, যে ঘটনা বারবার ঘটেছে আমাদের ইতিহাসে। আর এমনিতেও তো দেশ আমলাতন্ত্রই চালায়, রাজনীতিকরা থাকে ওপরে ওপরে মাত্র। কেননা আমাদের ব্যবস্থাটা আসলেই আমলাতান্ত্রিক। ব্রিটিশ আমলে ছিল তাই, পাকিস্তান আমলে আরও বেশি ছিল, বাংলাদেশ আমলে তার পরিবর্তন হয়নি। ঘন ঘন সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে, যখন সামরিক শাসন থাকে না, তখন বেসামরিক আমলাতন্ত্রই দেশ চালায়। রাজনীতিকরা নামে কর্তৃত্ব করেন, কাজে নয়।
রাজনীতিকদের নাম করে যেসব খুনাখুনি হয়, তাতে তাঁদের যে ক্ষতি হচ্ছে, সেটা কি তাঁরা বোঝেন না? হয়তো বোঝেন, কিন্তু বুঝলেও কিছু করতে পারেন না। অনুসারীরা তাঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। রাজনীতিতে অনুসারীদের খুব দরকার হয়, অনুসারী ভিন্ন আসলে রাজনীতিই অচল। অনুসারীরা না থাকলে কারা স্লোগান দিয়ে আকাশ ফাটাবে, বলবে, ‘তুমি এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার সাথে?’ কারা যাবে বিমানবন্দরে, নাচানাচি করবে উন্মত্তের মতো? ভোটের সময় (জাতীয় এবং স্থানীয়) ধরে নিয়ে আসবে ভোটারদের? প্রতিপক্ষকে ভয়ই-বা দেখাবে কারা? এসব কাজের জন্য লোক লাগে, অনিয়মিত বাহিনীর প্রয়োজন হয়।
কিন্তু অনিয়মিত বাহিনীকে কী দেবেন রাজনীতিকরা? নিয়মিত বাহিনীকে বেতনভাতা ইত্যাদি দেওয়া যায়। তবু তারা শান্ত থাকে না, উপরি নেয়, এমনকি ছিনতাইও করে, পুলিশের লোক ছিনতাই করছে বলে খবর বের হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। আর অনিয়মিত বাহিনীকে কী দেওয়া যাবে? হ্যাঁ, আদর্শ দেওয়া যায়। আদর্শ অনেক বড়, অন্য যে কোনো প্রাপ্তির চেয়ে। আদর্শের জন্য কর্মীরা প্রাণ পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত থাকে। বারবার দিয়েছে। দিয়েছে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে, দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে। দিল এই সেদিন, বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলনে। রাজনীতিকরা আজ সেই আদর্শটা দিতে পারছেন না তাঁদের কর্মীদের। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং বাঙালি জাতীয়বাদ আদর্শ ঠিকই, কিন্তু এদের শত্রু কে? শত্রু তো দেখা যাচ্ছে না? কার বিরুদ্ধে লড়বে তরুণ? প্রয়োজনে দেবে প্রাণ? এককালে ইংরেজ ছিল, পরে পাঞ্জাবি এলো।
এখন শত্রু কে? বিএনপি বলবে, জামায়াতে ইসলামী শত্রু; জামায়াত দেখিয়ে দেবে বিএনপিকে। কিন্তু কত বড় শত্রু তারা একে অপরের। আওয়ামী লীগ নেই, তার জোরও নেই; ইচ্ছা থাকলেও তাদের দৈত্য-দানব হিসেবে চিহ্নিত করাটা কঠিন নয়। বিএনপি ক্ষমতায় আছে এবং আগামী নির্বাচনের আগে তাকে নামানোর উপায় নেই, এ অবস্থায় তার বিরুদ্ধে তো যুদ্ধ হবে নির্বাচনের সময়ে, এখনকার যুদ্ধ জমবে না।
না, তরুণদের আদর্শ দেওয়া যাচ্ছে না, তেমন আদর্শ বর্তমানের রাজনৈতিক দল দুটির হাতে নেই যা তরুণদের হৃদয় ও মন কেড়ে নিতে পারে। তাহলে কী দেবেন তাঁরা? একটা জিনিসই দিতে পারেন, সেটা হচ্ছে বস্তু। অর্থ, প্রতিপত্তি, ক্ষমতা, এসব। তাই বোধ হয় দিচ্ছেন এবং সেগুলোর ভাগাভাগি নিয়েই যুদ্ধ হচ্ছে। খুনাখুনি চলছে। কমছে না, বাড়ছে। মাত্র সাড়ে সাত মাস গেছে, আরও তো সময় পড়ে আছে। হয়তো আরও বাড়বে। কোন দিকে এগোচ্ছি আমরা তার একটা লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বৈকি।
ছাত্রদের কথাটাই বিশেষভাবে ভাবতে হয়। তারাই ভবিষ্যৎ। তাদের মধ্যে খুনাখুনি বাড়ছে। একজন তরুণ অনেক কিছু চায়, বিশেষভাবে চায় বীর হতে। অন্যের কাছে তো বটেই, নিজের কাছেও। তা বীর হওয়ার উপায়টা কী? একটা উপায় ভালো ছাত্র হওয়া। কিন্তু সে বীরত্ব আজকাল খুব ফলপ্রসূ হচ্ছে না। এখন বরঞ্চ বীর তারাই, যাদের হাতে অস্ত্র রয়েছে। অস্ত্র থাকলে শক্তি থাকে, লোকে সমীহ করে, চেলা-চামুন্ডা জুটে যায়। বীর হওয়া যায় টাকা থাকলেও। বস্তুত সমাজে এখন টাকার শাসন অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত। রাজনৈতিক সংগঠনে ছাত্ররা যে আগে যেত সেও ওই বীরত্বের খোঁজেই। ভালো কাজ করছে, আদর্শের জন্য সংগ্রাম করছে, প্রবল শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছে, এই জ্ঞান নিজের মধ্যে এক ধরনের আনন্দ আনত, বীরত্বের একটা বোধ সৃষ্টি হতো। একতা গড়ে তুলত। এখন যারা দল করছে তারা ওই আদর্শটা পাচ্ছে না। তারা বীর হতে চায় অস্ত্র দেখিয়ে, বীর হতে চায় টাকার জোরে। ফলে খুনাখুনি প্রবল হয়।
আরও বড় সত্য একটা রয়েছে। সেটি বেকারত্ব। কাজ নেই। যে ছাত্রটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে থাকে, সে জানে যতদিন ওখানে আছে, ততদিন ভালোই আছে, হল ছাড়তে হলেই বিপদ। তখন তার পরিচয় কী? পরিচয় সে একজন বেকার যুবক। আর যে যুবক বেকার সে ক্রমাগত হতাশ হয়। হতাশ হয়ে যা ইচ্ছা তাই করে। ওই যে সন্ত্রাসী তরুণ, খুনাখুনি করে, প্রাণ দেয়, তার কাছে আসলে প্রাণের কোনো দাম নেই, সে যদি মস্তানি করার চেয়ে ভালো কোনো কাজ পেত তবে তাই করত। কিন্তু হায়, পায় না। চাকরি নেই, উপার্জনের পথ নেই। নিজেই চলতে পারে না, বাবা-মাকে সাহায্য করবে কী করে? এই পরিস্থিতিতে তার পক্ষে জীবন একটি কঠিন যন্ত্রণা। এ যন্ত্রণায় কাতর হয়ে সে উল্টাপাল্টা কাজ করে। গুন্ডামি করে সে যন্ত্রণা লাঘব করে। খুন করে। সব রাগ ওইভাবে মেটায় এবং খুন হয়ে যায়।
এই যে বেকারত্বের সমস্যা এটা যে কত ভয়াবহ তা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্যরা বোঝে না। বুঝতে চায় না। বোঝাটা তাদের জন্য প্রয়োজন হয় না। কেননা তারা সৌভাগ্যবান। তাদের চাকরি-বাকরি ঘর-সংসার রয়েছে। তাদের জন্য সমস্যা কী? কিন্তু কর্মহীনতা যার জন্য সমস্যা, সে বোঝে জীবন কত কঠিন। বেকারত্ব এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে এখন পেশাদার খুনি পাওয়া যাচ্ছে, লোক খুন করার জন্য।
ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি খুন হলেন একজন। কে খুন করল? শোনা যাচ্ছে তাঁরই বন্ধু। কাকে দিয়ে করাল খুন? ভাড়া করা লোক দিয়ে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ডাক্তার খুন হয়েছিলেন। ধরা পড়েছে ঢাকাইয়া আকবর। সে একজন পেশাদার খুনি। এই জিনিসটা আগে ছিল না। আগে বাড়ি থেকে ভাড়াটে উচ্ছেদ, কিংবা জায়গা-জমি দখল এসব কাজে লোক ভাড়া পাওয়া যেত। এখন পাওয়া যাচ্ছে লোক খুন করার কাজেও। দেশের উন্নতির হিসাব যাঁরা দেন, আশা করি তাঁরা এই হিসাবটাও বিবেচনার মধ্যে রাখবেন। ক’জনকে শাস্তি দেবেন? আর ধরা পড়লেই যে শাস্তি হবে তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়?
এর জন্য এমন আন্দোলন গড়ে তোলা, যাতে ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়। ব্যবস্থার পরিবর্তন এখনই ঘটবে না। কিন্তু চাপ ক্রমাগত তীব্র করে তুলতে হবে, যাতে ব্যবস্থাটা দুর্বল হয়, অন্তত মানুষের বিক্ষোভটা বোঝে, বোঝে যে মানুষ ক্ষেপে উঠছে, বোঝে যে ছাড় দিতে হবে টিকতে হলে এবং সেই চাপ বৃদ্ধি করাটা কাজ হবে, কাজের মতো, কাজ। এই কাজ বীরত্ব দেবে, অনুপ্রেরণা দেবে, আশার সৃষ্টি করবে।
♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়