ছবি: সংগৃহীত
ভারতের উদ্দেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, ‘অখণ্ড ভারত’ ধরনের যে কোনো সম্প্রসারণবাদী বা আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক কল্পনা বাংলাদেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা চাই সমতার বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সম্মান এবং ন্যায্য প্রতিবেশী সম্পর্ক। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ হওয়া উচিত বড় ভাই-ছোট ভাই নয়, দুই সার্বভৌম প্রতিবেশীর সমান মর্যাদার সম্পর্ক। আমরা আধিপত্য চাই না, সংঘাতও চাই না।
রোববার (৪ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা লেখেন।
পোস্টে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লেখেন, ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া ছাড়া ভারতের সামনে নাকি আর কোনো বিকল্প ছিল না। তিনি এটিকে একজন প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের দায়িত্ব হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছেন।
কিন্তু তার বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সুকৌশলে অনুচ্চারিত থেকে গেল, শুধু শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়, গত এক দশকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরিতে ভারতের ভূমিকা নিয়েও কি ভারত কখনো আত্মসমালোচনা করবে?
তিনি লেখেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের জনগণের ওপর যে ভয়াবহ দমন-পীড়ন হয়েছিল, জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের তদন্তে তার একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। জাতিসংঘের হিসাবে, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন এবং নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপকভাবে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করেছিল।
শেখ হাসিনার সরকারের সেই শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের প্রশ্ন দীর্ঘদিনের বলে মন্তব্য করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়রী। তার ভাষ্য-ফলে ভারত যখন আজ শুধু ‘প্রতিবেশীর দায়িত্ব’ বলে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে, তখন বাংলাদেশের মানুষের স্বাভাবিক প্রশ্ন, প্রতিবেশীর দায়িত্ব কি শুধু ক্ষমতাচ্যুত একজন শাসককে আশ্রয় দেওয়া, নাকি প্রতিবেশী দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা, মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বকেও সম্মান করা?
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক লেখেন, আরেকটি বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, সীমান্ত। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে প্রাণহানি এখনো বন্ধ হয়নি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হন; ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ২১টি সীমান্ত সহিংসতার ঘটনায় ১০ জন বাংলাদেশি নিহত এবং ১০ জন আহত হয়েছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, এমনকি ২০২৬ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch) ভারতের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বাঙালি বাসিন্দাদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগও নথিবদ্ধ করেছে। তাদের হিসাবে, জুনের প্রথম দিক থেকে ২০০-এর বেশি মানুষকে সীমান্তের দিকে ঠেলে দেওয়ার ২১টি প্রচেষ্টা বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষীরা ঠেকিয়েছে। অথচ ভারত-বাংলাদেশের নিজেদের সরকারি নথিতেই বলা আছে, সীমান্তে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি একটি উদ্বেগের বিষয় এবং দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের এমন ব্যবস্থা নিতে হবে যেন এ ধরনের ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনা যায়। তাহলে প্রশ্ন উঠবেই-প্রতিবেশীর দায়িত্বের কথা যদি বলা হয়, সেই দায়িত্ব সীমান্তে একজন নিরস্ত্র মানুষের জীবন রক্ষার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য নয় কেন?
বাংলাদেশ ভারতবিরোধী কোনো রাষ্ট্র হতে চায় না মন্তব্য করে তিনি লেখেন, আমরা চাই সমতার ভিত্তিতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, বন্ধুত্ব থাকবে, বাণিজ্য থাকবে, যোগাযোগ থাকবে, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক থাকবে। কিন্তু, তার ভিত্তি হবে পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা এবং ন্যায্য স্বার্থ। ভারতের উচিত বাংলাদেশের জনগণকে কোনো বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক কল্পনার অংশ হিসেবে নয়, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতির জনগণ হিসেবে দেখা।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লেখেন, ‘অখণ্ড ভারত’ ধরনের যে কোনো সম্প্রসারণবাদী বা আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক কল্পনা বাংলাদেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভূখণ্ড ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতি সম্মানই হতে পারে টেকসই প্রতিবেশী সম্পর্কের ভিত্তি।
তিনি আরও লেখেন, বাংলাদেশের নদীর ন্যায্য হিস্যা, সীমান্তে মানুষের নিরাপত্তা, বাণিজ্যে ভারসাম্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় মানবাধিকার, এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে অযাচিত প্রভাব, এসব প্রশ্নের সমাধান চাপ দিয়ে নয়, সমতার ভিত্তিতে আলোচনার মাধ্যমেই করতে হবে। গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদও ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা, আর বাংলাদেশ এরইমধ্যে নতুন করে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে।
এনসিপির এই নেতা লেখেন, ভারতের জন্য সময় এসেছে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝার: বাংলাদেশ কোনো অধীনস্থ ভূখণ্ড নয়, কোনো ‘পিছনের উঠান’ নয় এবং কোনো বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় কল্পনার অংশও নয়। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। ভারত যদি সত্যিই প্রতিবেশীর দায়িত্বের কথা বলে, তাহলে সেই দায়িত্বের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত,বাংলাদেশের জনগণের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত, জাতীয় মর্যাদা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভূখণ্ডের প্রতি পূর্ণ সম্মান।
আমরা আধিপত্য চাই না, সংঘাতও চাই না উল্লেখ করে শেষে পাটওয়ারী লেখেন, আমরা চাই সমতার বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সম্মান এবং ন্যায্য প্রতিবেশী সম্পর্ক। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ হওয়া উচিত বড় ভাই-ছোট ভাই নয়, দুই সার্বভৌম প্রতিবেশীর সমান মর্যাদার সম্পর্ক।