ঢাকা
০৫ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম
এনসিপি কার্যালয়ে সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ আমরা আধিপত্য চাই না, সংঘাতও চাই না: ভারতকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ডেঙ্গুতে হাসপাতালগুলোতে জায়গা নেই, সরকার দায়িত্ব পালন করছে না : গোলাম পরওয়ার মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার শ্রমিক পাঠানোর সিদ্ধান্ত : শ্রমমন্ত্রী খুলনায় পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকে গু‌লি করে হত্যা যানজট নিরসনে বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণের গতি বাড়ানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর আমলাতন্ত্র সংস্কারবিরোধী, আমলারা রাজনৈতিক প্রভুদের অধী‌নে চল‌তে চায় : আলী রীয়াজ লালবাগে যুব মহিলা লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শারমিন গ্রেপ্তার দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাসহ সব প্রতিষ্ঠানই বিধ্বস্ত অবস্থায় : জামায়াত আমির শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকবে: ইরান
Advertise with us

সেপ্টেম্বরে সারাদেশে সড়কে ঝরল ৪২৩ প্রাণ, প্রতিদিন গড়ে প্রাণহানি ১৪ জনের

ডেস্ক রিপোর্ট
রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬   ২৮ বার পঠিত
সেপ্টেম্বরে সারাদেশে সড়কে ঝরল ৪২৩ প্রাণ, প্রতিদিন গড়ে প্রাণহানি ১৪ জনের

ছবি: ফাইল ছবি

সেপ্টেম্বরে দেশে ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৬৭৪ জন। নিহতদের মধ্যে ৭৩ জন নারী ও ৬১ জন শিশু। মোট নিহতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। একই সময়ে ১০৬ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট প্রাণহানির ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

রবিবার (৪ অক্টোবর) সেপ্টেম্বর মাসের সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশ করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সংগঠনটির নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ১৫৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৯ জন নিহত হয়েছেন। মোট দুর্ঘটনার ৩৪ দশমিক ৮৪ শতাংশই ছিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। এ ছাড়া যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৩ জন, যা মোট প্রাণহানির ১২ দশমিক ৫২ শতাংশ।

আঞ্চলিক সড়কেই বেশি দুর্ঘটনা

দুর্ঘটনার স্থান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ১৭৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে, যা মোট দুর্ঘটনার ৪০ দশমিক ২৭ শতাংশ। জাতীয় মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৪৫টি, গ্রামীণ সড়কে ৫৬টি এবং শহরের সড়কে ৬৩টি। দুর্ঘটনার ধরন বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। এ ধরনের দুর্ঘটনা ছিল ১৬৮টি বা ৩৮ শতাংশ। পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা ছিল ১০৯টি বা ২৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯৮টি বা ২২ দশমিক ১৭ শতাংশ, যানবাহনের পেছনে আঘাতের কারণে ৬১টি বা ১৩ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং অন্যান্য কারণে ছয়টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।

নিহতদের বড় অংশ মোটরসাইকেল ও থ্রি-হুইলারে

যানবাহনভিত্তিক হিসাবে সেপ্টেম্বরে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৩৯ জন নিহত হয়েছেন। থ্রি-হুইলার যাত্রী নিহত হয়েছেন ৮৮ জন। এ ছাড়া বাসের যাত্রী ২৬ জন, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের যাত্রী ২১ জন, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও ট্রলির আরোহী ১৯ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী ১৮ জন এবং বাইসাইকেল আরোহী ছয়জন নিহত হয়েছেন। সেপ্টেম্বরের দুর্ঘটনাগুলোতে মোট ৬৯১টি যানবাহন সম্পৃক্ত ছিল। এর মধ্যে ছিল ১৬২টি মোটরসাইকেল, ১২৯টি থ্রি-হুইলার, ১১৩টি বাস, ৯৩টি ট্রাক, ৪৬টি অজ্ঞাত যানবাহন, ৩২টি স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন, ২৯টি কাভার্ডভ্যান, ১৭টি পিকআপ, ১২টি মাইক্রোবাস, ১৫টি প্রাইভেটকার, আটটি অ্যাম্বুলেন্স, পাঁচটি জিপ, সাতটি লরি, ছয়টি ট্রলি, চারটি ট্রাক্টর, তিনটি ড্রাম ট্রাক, দুটি সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী ট্রাক এবং আটটি বাইসাইকেল।

ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি

বিভাগের হিসাবে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে ১৩২টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। মোট দুর্ঘটনার ২৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং মোট প্রাণহানির ৩১ দশমিক ৬৭ শতাংশই এই বিভাগে। চট্টগ্রাম বিভাগে মোট দুর্ঘটনার ১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ ও প্রাণহানির ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ, খুলনা বিভাগে যথাক্রমে ১৭ দশমিক ৪২ ও ১৪ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং রাজশাহী বিভাগে ১২ দশমিক ২১ ও ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ময়মনসিংহে দুর্ঘটনার ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ ও প্রাণহানির ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ, বরিশালে ৫ দশমিক ২০ ও ৬ দশমিক ৬১ শতাংশ, রংপুরে ৫ দশমিক ৬৫ ও ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং সিলেটে ৪ দশমিক ৫২ ও ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। একক জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ৩৮ জন নিহত হয়েছেন গাজীপুরে। আর বিভাগ হিসেবে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে সিলেটে- ২০টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২১ জন। রাজধানী ঢাকায় সেপ্টেম্বরে ৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত ও ৪৭ জন আহত হয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে শিক্ষক-শিক্ষার্থীও রয়েছেন

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে নিহতদের পেশাগত পরিচয়ও বিশ্লেষণ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এতে দেখা যায়, নিহতদের মধ্যে দুই পুলিশ সদস্য, একজন সেনা সদস্য, ১৩ জন শিক্ষক, তিনজন সাংবাদিক, দুজন চিকিৎসক, চারজন প্রকৌশলী, একজন কাস্টমস কর্মকর্তা, একজন বিদেশি নাগরিক এবং ব্যাংক-বীমা খাতের ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এছাড়া ১৮ জন এনজিও কর্মী, ২৪ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, বিভিন্ন পর্যায়ের ২৫ জন ব্যবসায়ী, ওষুধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর ২১ জন বিক্রয় প্রতিনিধি, তিনজন মসজিদের ইমাম বা খাদেম, চারজন মোটর মেকানিক, ছয়জন পোশাক শ্রমিক, একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ১৪ জন দিনমজুর এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫৮ জন শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। সময়ভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ২৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে সকালে। দুপুরে ২১ দশমিক ২৬ শতাংশ, বিকেলে ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ, রাতে ১৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ, সন্ধ্যায় ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ভোরে ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

সড়কের পাশাপাশি নৌ ও রেলপথেও প্রাণহানি

সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনার পাশাপাশি নৌ ও রেল দুর্ঘটনাতেও প্রাণহানি ঘটেছে। এ সময়ে ১১টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, সাতজন আহত এবং চারজন নিখোঁজ হয়েছেন। একই সময়ে ২৩টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংগঠনটির বিশ্লেষণে, অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানো দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করে সংগঠনটি। একই সঙ্গে যানবাহনের বেপরোয়া গতি ও পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহতের ঘটনাও বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ জন্য সরকারি উদ্যোগে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জীবনমুখী সচেতনতামূলক প্রচারণার সুপারিশ করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা এবং শারীরিক-মানসিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছে। এর পাশাপাশি অনির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা ও আইন না মানা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকেও দুর্ঘটনার পেছনে দায়ী করা হয়েছে।

নিরাপদ সড়কে একগুচ্ছ সুপারিশ

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন এবং বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। পাশাপাশি আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার, রাজধানীতে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালু এবং দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। চালকদের বেতন, কর্মঘণ্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য সার্ভিস রোড নির্মাণ এবং সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগের সুপারিশও রয়েছে। সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা ও দক্ষতা বাড়াতে বাজেটে অর্থ বরাদ্দ এবং সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনকে সমন্বিত করে অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছে সংগঠনটি।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, সময়োপযোগী নীতিমালা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রমের সমন্বয়ের মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এ জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে সংগঠনটি।

Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us