ছবি: সংগৃহীত
যুদ্ধের শুরুর দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন- ‘প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দিব। সব কিছু ধ্বংস করে দিব’।
সেই যুদ্ধ ইতোমধ্যে সাড়ে পাঁচ মাস অতিক্রম করেছে। এই সময়ে ইরানের অনেক ক্ষতি হয়েছে। হতাহত হয়েছে বহুসংখ্যক ইরানি কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষ। তবে পিছু হটেনি তেহরান।
বরং ইরান এখন ট্রাম্পের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই আতঙ্ক ট্রাম্পের মধ্যে এতটাই জেকে বসেছে যে, কোনওভাবে নিজেকে আর নিরাপদ মনে করতে পারছেন না তিনি।
এর একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে- তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলন শেষে ট্রাম্পের দেশে ফেরার ঘটনা। ওই সময় ইরানের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট গোপনে বিমান বদল করেছিলেন। এ সময় তাকে একটি ক্যাটারিং ট্রাকের মাধ্যমে প্রকাশ্য বিমান থেকে সরিয়ে অন্য একটি সামরিক বিমানে নেওয়া হয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, গত মাসে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলন শেষে ট্রাম্পকে প্রথমে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে উঠতে দেখা যায়। কিন্তু এরপরই অত্যন্ত গোপনীয় একটি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাকে অপেক্ষাকৃত ছোট একটি সামরিক বিমানে স্থানান্তর করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যাটারিং ট্রাককে বিমানের দরজা পর্যন্ত উঁচু করে তোলা হয়েছিল। ওই ট্রাকের আড়াল ব্যবহার করে ট্রাম্পকে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে সরিয়ে একটি সি-৩২এ সামরিক বিমানে নেওয়া হয়। বিমানটি মূলত মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত হয় এবং এটি বোয়িং ৭৫৭-এর পরিবর্তিত সংস্করণ।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ট্রাম্পের সঙ্গে থাকা সাংবাদিক এবং হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মকর্তাও ওই সময় জানতেন না যে, প্রেসিডেন্ট আর তাদের সঙ্গে থাকা বিমানে নেই।
বিমানে হামলার ‘বিশ্বাসযোগ্য’ হুমকি
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য হুমকি শনাক্ত করেছিল, যাতে ইরান ট্রাম্পকে বহনকারী বিমানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে।
তবে হোয়াইট হাউস এখনও গোপনে বিমান বদলের বিষয়টি সরাসরি নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি।
ওই সময় ট্রাম্প নিজেও ইরানকে তার জীবনের জন্য বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। ন্যাটো সম্মেলনের সময় তিনি বলেছিলেন, ইরানের কাছে তিনি ‘নাম্বার ওয়ান টার্গেট’।
এর এক দিন আগেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক হামলা শুরু করেছিল। ফলে ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রকাশ্যে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন ট্রাম্প
ট্রাম্প তুরস্কে পৌঁছেছিলেন কাতারের উপহার দেওয়া নতুন বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমানে। কিন্তু সেখান থেকে ফেরার সময় তিনি পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান ব্যবহারের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, পুরোনো বিমানটিতে তিনি ‘পুরোনো দিনের স্মৃতির জন্য’ ফিরতে চান।
৮ জুলাই আঙ্কারা বিমানবন্দরে ক্যামেরার সামনে ট্রাম্পকে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে উঠতেও দেখা যায়। কিন্তু ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানে ওঠার পর তাকে গোপনে অন্য একটি বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
বিমানের যে পাশে ট্রাম্প প্রকাশ্যে উঠেছিলেন, তার বিপরীত পাশে একটি ক্যাটারিং ট্রাককে বিমানের দরজার উচ্চতা পর্যন্ত তুলে রাখা হয়েছিল। ওই ট্রাকের আড়ালেই তাকে সি-৩২এ বিমানে নিয়ে যাওয়া হয়।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও আলাদাভাবে সিঁড়ি ব্যবহার করে ওই সি-৩২এ বিমানে ওঠেন। উদ্দেশ্য ছিল পুরো বিষয়টিকে স্বাভাবিক বিমানযাত্রা হিসেবে দেখানো।
সাংবাদিকদের জানানো হয়নি প্রেসিডেন্ট বিমানে নেই
ট্রাম্পের সঙ্গে থাকা সাংবাদিকরা পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানেই ওঠেন। তাদের বিমানের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের পাশাপাশি হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মকর্তাও নাকি জানতেন না যে, প্রেসিডেন্ট তাদের সঙ্গে একই বিমানে নেই।
অন্যদিকে, ট্রাম্পকে বহনকারী সি-৩২এ আলাদাভাবে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে উড়ে যায়। পরে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্সের মিলডেনহল ঘাঁটিতে অবতরণের পর পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে ট্রাম্পকে নামতে দেখা যায়।
তবে সি-৩২এ থেকে কীভাবে ট্রাম্পকে আবার পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে নেওয়া হয়েছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এরপর ট্রাম্প কাতারের দেওয়া নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন এবং সেটিতে করে ওয়াশিংটনে ফেরেন।
হোয়াইট হাউসের বক্তব্য কী
হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিভেন চিয়াং গোপন বিমান বদলের বিষয়ে সরাসরি কোনও মন্তব্য করেননি। তবে তিনি নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানকে প্রেসিডেন্ট ও তার কর্মীদের সুরক্ষার জন্য অত্যাধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় সজ্জিত একটি ‘স্টেট-অব-দ্য-আর্ট’ বিমান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এর আগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ট্রাম্প কিংবা তাকে বহনকারী বিমানে হামলার একটি নির্দিষ্ট হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিল বলে সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল।
নিউইয়র্ক টাইমসও এর আগে কাতারের উপহার দেওয়া নতুন বিমানটি নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা জানিয়েছিল। পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ন্যাটো সম্মেলন শেষে ট্রাম্পকে দেশে ফেরানোর সময় সিক্রেট সার্ভিস তাকে অন্য একটি বিমানে স্থানান্তরের পরামর্শ দিয়েছিল।
এই সংক্রান্ত তথ্য ফাঁস হওয়ার ঘটনায় নিউইয়র্ক টাইমসের কয়েকজন সাংবাদিককে শপথের অধীনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছিল। পরে মার্কিন বিচার বিভাগ বিবিসিকে জানায়, গোপন তথ্য বেআইনিভাবে ফাঁস হওয়ার ঘটনা নিয়ে তদন্ত চলছে। সূত্র: বিবিসি