ছবি: সংগৃহীত
হেপাটাইটিস সি নির্মূলের পথে এগিয়ে যাচ্ছে ইংল্যান্ড। বিপজ্জনক এই ভাইরাসটি মূলত লিভারকে আক্রান্ত করে। দেশটির সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আক্রান্তদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস সি নির্মূলের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত সময়ের আগেই অর্জন করতে পারে ইংল্যান্ড।
হেপাটাইটিস সিতে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত ব্যক্তিদের ৮০ শতাংশকে চিকিৎসার আওতায় আনার লক্ষ্য ইতোমধ্যেই পূরণ হয়েছে। গত এক দশকে এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যাও ৩৬ শতাংশ কমেছে। তবে ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য মৃত্যুহার কমানোর ক্ষেত্রে আরও অগ্রগতি প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক চিকিৎসায় হেপাটাইটিস সি এখন আর দীর্ঘমেয়াদি অনিবার্য রোগ নয়। মাত্র ৮ থেকে ১২ সপ্তাহ অ্যান্টিভাইরাল ট্যাবলেট সেবন করলেই ৯৫ শতাংশের বেশি রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।
নীরব ঘাতক হেপাটাইটিস সি
হেপাটাইটিস সি রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তের সংস্পর্শে এলে অন্য ব্যক্তির শরীরে ভাইরাসটি প্রবেশ করতে পারে। একই সূঁচ বা সিরিঞ্জ ব্যবহার করা এর অন্যতম সংক্রমণপথ। তবে রক্তদানের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত রক্তে হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের উপস্থিতি এখন নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়।
রোগটির অন্যতম বিপজ্জনক দিক হলো- এটি অনেক সময় দীর্ঘদিন কোনও উপসর্গ সৃষ্টি করে না। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের শরীরে ভাইরাস থাকার বিষয়টি বুঝতেই পারেন না। এ কারণে হেপাটাইটিস সি-কে অনেক সময় ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়।
চিকিৎসা না করালে দীর্ঘমেয়াদে ভাইরাসটি লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। এমনকি গুরুতর ও প্রাণঘাতী লিভার রোগও হতে পারে।
চিকিৎসা পেয়েছেন এক লাখের বেশি মানুষ
এনএইচএস ইংল্যান্ডের তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে দেশটিতে এক লাখের বেশি মানুষ হেপাটাইটিস সি-তে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন এবং চিকিৎসা পেয়েছেন। এর ফলে আক্রান্তদের ৮০ শতাংশকে চিকিৎসার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা ইতোমধ্যে পূরণ হয়েছে।
তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য এখনও পূরণ হয়নি। ২০১৫ সালের তুলনায় হেপাটাইটিস সি-সম্পর্কিত মৃত্যুহার ৬৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। এখন পর্যন্ত সেই লক্ষ্যে পুরোপুরি পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে ২০৩০ সালের নির্ধারিত সময়সীমার আগেই তা অর্জন করা সম্ভব হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে প্রায় ৫০ হাজার ২০০ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হেপাটাইটিস সি নিয়ে বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে আনুমানিক ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশের রোগ শনাক্ত হয়েছে। অথচ ২০৩০ সালের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্য হলো আক্রান্তদের ৯০ শতাংশকে শনাক্ত করা।
হাসপাতালে ও বাড়িতে পরীক্ষার সুযোগ
হেপাটাইটিস সি শনাক্ত করতে ইংল্যান্ডে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জরুরি বিভাগে রক্ত পরীক্ষা, জিপিতে নিবন্ধনের সময় পরীক্ষা এবং বাড়িতে বসে বিনামূল্যে পরীক্ষা করার সুযোগের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে আগে শনাক্ত না হওয়া রোগীদের খুঁজে বের করা হচ্ছে।
এনএইচএস ইংল্যান্ড বলছে, এসব উদ্যোগের ফলে এমন অনেক মানুষকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যারা নিজেদের শরীরে ভাইরাস থাকার বিষয়টি জানতেন না।
আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের বিনামূল্যে ও গোপনীয়ভাবে বাড়িতে বসে হেপাটাইটিস সি পরীক্ষা করার কিট সংগ্রহের আহ্বান জানিয়েছে এনএইচএস।
এ জন্য জিপির সঙ্গে কথা বলারও প্রয়োজন নেই। অনলাইনে অর্ডার করলেই বিনামূল্যে বাড়িতে বসে পরীক্ষা করার কিট পাওয়া যায়।
কয়েকটি দেশের নাগরিকদের বিশেষভাবে পরীক্ষার আহ্বান
ইংল্যান্ডে বসবাসকারী ইউক্রেন, রোমানিয়া, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, পোল্যান্ড, আলবেনিয়া, লিথুয়ানিয়া, বুলগেরিয়া, চেকিয়া ও স্লোভাকিয়া-জন্ম প্রাপ্তবয়স্কদের বিশেষভাবে হেপাটাইটিস সি পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কারণ, তাদের কেউ কেউ ১৯৯১ সালের আগে চিকিৎসা বা দাঁতের চিকিৎসার সময় ব্যবহৃত সরঞ্জামের মাধ্যমে ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন কোনও উপসর্গ না থাকলেও শরীরে ভাইরাসটি থাকতে পারে। তাই ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য অর্জনের দ্বারপ্রান্তে
হেপাটাইটিস সি ট্রাস্টের ভাষায়, ইংল্যান্ড এখন দেশটির জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের ‘দ্বারপ্রান্তে’ রয়েছে।
এনএইচএসের জাতীয় মেডিকেল পরিচালক অধ্যাপক ফ্র্যাঙ্কি সোর্ডস বলেন, হেপাটাইটিস সি নির্মূলের বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় ইংল্যান্ড এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং ২০৩০ সালের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে রয়েছে।
তিনি বলেন, লক্ষ্য অর্জনের গতি ধরে রেখে পুরো কাজ শেষ করতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
অধ্যাপক সোর্ডস আরও বলেন, যাদের সহায়তা প্রয়োজন, তাদের সবাইকে শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনার বিষয়ে এনএইচএস প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের অনলাইনে বিনামূল্যে ও গোপনীয় বাড়িতে ব্যবহারের পরীক্ষার কিট অর্ডার করার আহ্বানও জানান তিনি।
নিয়মিত রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়ে পল ইটওয়েলের রোগ
হেপাটাইটিস সি অনেক সময় কোনও উপসর্গ ছাড়াই শরীরে বছরের পর বছর থাকতে পারে- ব্ল্যাকবার্ন, ল্যাঙ্কাশায়ারের ৬৫ বছর বয়সী পল ইটওয়েলের ঘটনা তারই উদাহরণ।
নিয়মিত রক্ত পরীক্ষার সময় তার শরীরে হেপাটাইটিস সি শনাক্ত হয়।
রোগ নির্ণয়ের পর প্রথম প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ইটওয়েল বলেন, তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে, তার হেপাটাইটিস সি হয়েছে। তার কোনও অসুস্থতাবোধও ছিল না। ফলে কীভাবে তিনি ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হলেন, সেটি নিয়েও তিনি বিস্মিত ছিলেন।
তবে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া সহায়তা তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে জানান তিনি।
ইটওয়েল কীভাবে হেপাটাইটিস সিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে কয়েক দশক আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় তার একটি অস্ত্রোপচারের সময় সংক্রমণ হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
দূষিত রক্তে সংক্রমণের ভয়াবহ ইতিহাস
ইংল্যান্ডের হেপাটাইটিস সি নির্মূলের অগ্রগতির পেছনে দেশটির অতীতের একটি ভয়াবহ স্বাস্থ্য কেলেঙ্কারির ইতিহাসও রয়েছে।
১৯৭০ থেকে ১৯৯১ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যে দূষিত রক্ত ও রক্তজাত পণ্য এবং রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ এইচআইভি ও হেপাটাইটিস সি-তে আক্রান্ত হন।
ঘটনাটি ‘ইনফেক্টেড ব্লাড স্ক্যান্ডাল’ বা দূষিত রক্ত কেলেঙ্কারি নামে পরিচিত। এটিকে এনএইচএসের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চিকিৎসা বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এর পর থেকে প্রায় তিন হাজার মানুষ মারা গেছে এবং ভবিষ্যতে আরও মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই কেলেঙ্কারি নিয়ে গঠিত সরকারি তদন্তে উঠে আসে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের অগ্রহণযোগ্য ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
তবে সেই দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক ইতিহাসের পর হেপাটাইটিস সি শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় ইংল্যান্ডের বর্তমান অগ্রগতি দেশটির জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আধুনিক অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসার উচ্চ সাফল্যের হার, ব্যাপক পরীক্ষা এবং বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার কারণে ২০৩০ সালের আগেই ইংল্যান্ড হেপাটাইটিস সি নির্মূলের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। সূত্র: বিবিসি