ছবি: সংগৃহীত
জুলাই আন্দোলনের সময় যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা দুই হত্যা মামলায় তদন্ত শেষে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় ১৬১ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
এর মধ্যে শ্রমিকদল কর্মী রিয়াজুল তালুকদার হত্যা মামলায় শেখ হাসিনাসহ ২২ জনের নামে গত ১৯ আগস্ট অভিযোগপত্র জমা দেন পুলিশের এন্টি টেরোরিজম ইউনিটের পরিদর্শক নজীব আহম্মেদ। তবে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় ১২২ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। অপরদিকে, রাজমিস্ত্রি বাবলু মৃধা হত্যা মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৩৩ জনের নামে গত ১৩ আগস্ট অভিযোগপত্র জমা দেন যাত্রাবাড়ী থানার এসআই মাহমুদুল হাসান ইরফান। তবে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় ৩৯ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
দুই মামলায় অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার বিষয় নিশ্চিত করেন প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক মহিন উদ্দিন।
রাজমিস্ত্রি বাবুল মৃধা হত্যা
জুলাই আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে ৩টার দিকে যাত্রাবাড়ীর শনিরআখড়া এলাকায় বাবুল মৃধার ছেলে আবু তালেব সজীব আন্দোলনে অংশ নেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত সজীবের সঙ্গে তার বাবার মোবাইলে যোগাযোগ ছিল। সন্ধ্যার পর যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলে বাবুল মৃধা ছেলেকে খুঁজতে বের হন। ছেলেকে না পেয়ে রাত ৮টার দিকে শনিরআখড়া দেশবাংলা হাসপাতালের সামনে দিয়ে বাসায় ফিরছিলেন তিনি। সেখানে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। পরে লোকজন তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।
এদিকে রাতে বাসায় না ফেরায় পরিবারের লোকজন বাবুল মৃধাকে খুঁজতে বের হন। রাত ১টার দিকে খবর পান, বাবুল মৃধা গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। সেখানে ২৩ দিন চিকিৎসা গ্রহণের পর বাবুল মৃধাকে ১৩ আগস্ট পিলখানা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে নেওয়া হয় সিএমএইচ হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ সেপ্টেম্বর মারা যান বাবুল মৃধা। এ ঘটনায় বাবুল মৃধার স্ত্রী সীমা বেগম ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর শেখ হাসিনাসহ ৭০ জনের নামে মামলা দায়ের করেন।
মামলার তদন্ত শেষে শেখ হাসিনাসহ ৩৩ জনের নামে গেল ১৩ আগস্ট অভিযোগপত্র জমা দেন যাত্রাবাড়ী থানার উপ-পরিদর্শক মাহমুদুল হাসান ইরফান। তবে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় ৩৯ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
অভিযুক্ত অপর আসামিদের মধ্যে রয়েছেন— সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, যাত্রাবাড়ী-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কাজী মনিরুল ইসলাম মনু, পটুয়াখালী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এস.এম. শাহজাদা, পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজ, বরিশাল-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য পঙ্গজ নাথ, নেত্রকোণা-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আহমেদ হোসেন, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ।
আরও রয়েছেন— সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি কামরুল হাসান রিপন, যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ মুন্না, ভান্ডারিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলাম মিরাজ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সজল কুন্ড।
অব্যাহতির সুপারিশ পাওয়া আসামিদের মধ্যে রয়েছেন— ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আতিকুর রহমান, ৬৩ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য হাবিবুর রহমান, যাত্রাবাড়ী থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক অর্থ দাস, রবিন খান ওরফে মেকাপ রবিন, মনির আহমেদ, লুৎফুর রহমান। মামলার তদন্তকালে সন্ধিগ্ধ আসামি হিসেবে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ মামলায় কাজী মনিরুল ইসলাম মনু, চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ তিনজন কারাগারে রয়েছেন। ৮ আসামি জামিনে রয়েছেন। অপর আসামিরা পলাতক।
যোগাযোগ করা হলে মামলার বাদী সীমা বেগম বলেন, আমার স্বামী রাজমিস্ত্রীর কাজ করতেন। খাওয়া, পড়া দিয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে ভালোভাবেই সংসার চলছিল। এর মধ্যে স্বামী মারা গেল। আমি এর বিচার চাই। তিনি বলেন, বড় ছেলেটা এবার দনিয়া কলেজ থেকে ইন্টার পরীক্ষা দিছে। সে ঢাকায় থাকে। আমরা গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর দশমিনা চলে আসছি। ঢাকা থাকলে বাসা ভাড়া দিতে হয়। স্বামী যখন ছিল টেনশন ছিল না। পুরুষ মানুষ না থাকলে যা হয়। তিনিই সবকিছু দেখাশোনা করতেন। আমার স্বামী খুব ভালো ছিল। ভালো মানুষ ছিল দেখে হয়ত আল্লাহ তাকে নিয়ে গেছেন। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই।
এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার উপ-পরিদর্শক মাহমুদুল হাসান ইরফান জানান, তদন্ত শেষে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা মেলেনি তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
শ্রমিকদল কর্মী রিয়াজুল তালুকদার হত্যা
জুলাই আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট যাত্রাবাড়ী থানার সামনে আন্দোলনে অংশ নেন শ্রমিকদল কর্মী রিয়াজুল তালুকদার। বিকেল ৫টার দিকে পিঠের নিচে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। স্থানীয় লোকজন ভিক্টিমের ফোন থেকে তার স্ত্রীকে জানায় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে আছেন। এরপর তার বড় ভাই ও চাচাতো ভাইয়েরা ঘটনাস্থলে গিয়ে রিয়াজুলকে রক্তাক্ত ও গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রাস্তার ওপর পড়ে থাকতে দেখেন। তখনও বাঁচার আকুতি জানাচ্ছিলেন রিয়াজুল। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যান তার স্বজনরা। অবস্থার অবনতি দেখে চিকিৎসক দুই ব্যাগ রক্ত ম্যানেজ করার কথা জানান। পরে ৮টা ১৫ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক।
এ ঘটনায় ভিকটিমের বড় ভাই রুবেল তালুকদার বাদী হয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলায় হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ১৩৫ জনকে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়। এছাড়া ৩৫০ থেকে ৪০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।
মামলার তদন্ত শেষে শেখ হাসিনাসহ ২২ জনের নামে গত ১৯ আগস্ট অভিযোগপত্র জমা দেন পুলিশের এন্টি টেরোরিজম ইউনিটের পরিদর্শক নজীব আহম্মেদ। তবে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় ১২২ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
অভিযুক্ত অপর আসামিদের মধ্যে রয়েছেন— সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক এমপি মশিউর রহমান মোল্লা, সাবেক উপ-মন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক, সাবেক এমপি ইকবাল হোসেন অপু, সাবেক এমপি নাহিম রাজ্জাক।
অব্যাহতির সুপারিশ পাওয়া আসামিদের মধ্যে রয়েছেন— নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি রাজিবুল ইসলাম বাপ্পি, শরীয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অনল কুমার দে, সাবেক আইজিপি শহীদুল হকের ছোট ভাই ইসমাইল হক।
এ মামলায় ফারুক হাওলাদার, লাক মিয়া, আব্দুল আলীম বেপারী, কুদ্দুস বেপারীসহ ৬ জন কারাগারে রয়েছেন। অপর আসামিরা পলাতক রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির সুপারিশ করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা নজীব আহম্মেদ বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি। তবে ১২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।