ছবি: সংগৃহীত
১৯৮৫ সালের ভয়াবহ এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৮২ ‘কণিষ্ক’ বোমা হামলার দীর্ঘ ৪১ বছর পর মামলার তদন্ত কার্যক্রম গুটানোর ইঙ্গিত দিয়েছে কানাডিয়ান পুলিশ। রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ এই ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী ঘটনার তদন্ত কমিয়ে এনে মামলাটি নিষ্ক্রিয় স্ট্যাটাসে পাঠানোর চিন্তাভাবনা করছে। এই খবরে চার দশক ধরে বিচারের আশায় পথ চেয়ে থাকা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শুরুতে কানাডার টরন্টোতে আয়োজিত বৈঠকে কানাডিয়ান পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা ভুক্তভোগীদের স্বজনদের ডেকে এই নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানান। এই বৈঠকে উপস্থিত থাকা স্বজনদের দাবি, বিগত দুই দশকের মধ্যে এটিই ছিল তাদের সাথে পুলিশের প্রথম কোনো আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং।
১৯৮৫ সালের ২৩ জুন মন্ট্রিল থেকে লন্ডনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট ১৮২ বিমানটিতে আয়ারল্যান্ড উপকূলের আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর মাঝআকাশে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। এতে বিমানে থাকা ৩২৯ জন আরোহীর সবাই নির্মমভাবে প্রাণ হারান, যাদের মধ্যে ২৬৮ জনই ছিলেন কানাডিয়ান নাগরিক। একই দিনে প্রায় একই সময়ে জাপানের টোকিও শহরের নারিতা বিমানবন্দরে একই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে অপর একটি বোমা বিস্ফোরণে দুজন ল্যাগেজ হ্যান্ডলার নিহত হন। কানাডা সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এটিকে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস ও ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে গণ্য করে থাকে। এই ঘটনা কানাডার নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার এক বিরাট ব্যর্থতাকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।
তদন্ত স্থগিতের এই প্রক্রিয়ার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে কণিষ্ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং হামলায় বাবা, মা ও ছোট বোনকে হারানো সঞ্জয় লাজার কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে একটি অত্যন্ত আবেগঘন চিঠি পাঠিয়েছেন। ১৬ সেপ্টেম্বর লেখা এই চিঠিতে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ৪১ বছর পর কানাডিয়ান পুলিশ এখন ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছেই নতুন তথ্য বা তথ্যসূত্র চাইছে, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও আপত্তিকর। চিঠিতে সঞ্জয় লাজার প্রশ্ন তোলেন, চার দশক ধরে বিশাল বাহিনী নিয়ে তদন্ত চালানোর পর পুলিশ যদি নিজেরা কোনো অপরাধীকে চিহ্নিত করতে না পারে, তবে সেই দায় সাধারণ স্বজনদের ওপর চাপানো কতটা যুক্তিসঙ্গত। সমস্ত আইনি ও তদন্তমূলক সুযোগ সততার সাথে শেষ করা হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত না করে মামলাটি নিষ্ক্রিয় করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না বলে তিনি জানান।
কানাডার সাবেক বিচারপতি জন মেজরের নেতৃত্বাধীন ঐতিহাসিক গণতদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে আগেই স্বীকার করা হয়েছিল যে, এয়ার ইন্ডিয়া ট্র্যাজেডির নেপথ্যে কানাডার তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থা, নিরাপত্তা বিভাগ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতা ও ব্যর্থতা বিদ্যমান ছিল। মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও অডিও টেপ মুছে ফেলা, প্রমাণের অভাব এবং সাক্ষীদের মৃত্যু বা হুমকির কারণে এতদিনেও মূল ষড়যন্ত্রকারীরা বিচারের আওতায় আসেনি। পুরো ঘটনায় কেবল ইন্দ্রিজিৎ সিং রিয়াত নামক এক ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হলেও ২০০৫ সালে অন্য দুজন অভিযুক্ত বেকসুর খালাস পান।
এই পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, বর্তমান তদন্তকারী দল যদি ব্যর্থ হয় তবে অন্য কোনো দক্ষ টিমের হাতে এই দায়িত্ব তুলে দিতে হবে। এছাড়া ১৯৯৫ সালে অপরাধীদের তথ্যের জন্য ঘোষিত ১ মিলিয়ন ডলারের অনুত্তোলিত পুরস্কারের পরিমাণ বাড়িয়ে নতুন করে বিশ্বব্যাপী তথ্য সংগ্রহের জোর আবেদন জানানোর দাবি জানান তারা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হার্পারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি স্মরণে এনে সঞ্জয় লাজার তার চিঠির অনুলিপি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, উভয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কানাডার জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রীদের কাছে পাঠিয়েছেন।
সূত্র: এনডিটিভি