রাশিয়ার কাছ থেকে তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেওয়ার একটি বিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করেছে।
বিলটি আইনে পরিণত হলে রুশ জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের সুযোগ পাবেন ট্রাম্প। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও চীনও রয়েছে।
‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ নামের বিলটি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রতিনিধি পরিষদে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগত বাধা পেরিয়ে যায়। এতে দুই ডেমোক্র্যাট রিপাবলিকানদের সঙ্গে যোগ দিয়ে বিলটির পক্ষে ভোট দেন। ফলে ২১৪-২১১ ভোটে প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়।
বুধবার প্রতিনিধি পরিষদে বিলটির ওপর চূড়ান্ত ভোট হওয়ার কথা। সেখানে অনুমোদন পেলে এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হবে। এর আগে গত ৭ আগস্ট মার্কিন সিনেট ৮৬-১১ ভোটে বিলটি ব্যাপক ব্যবধানে পাস করে।
ভারত ও চীন সম্ভাব্য লক্ষ্য
বিলের প্রস্তাবিত বিধানের আওতায় রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলোর ওপর দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা বা শুল্ক আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে। সিনেটের অনুমোদিত সংস্করণে নির্দিষ্টভাবে কোনও দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের পরিমাণের ভিত্তিতে সবচেয়ে বড় পাঁচ আমদানিকারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ভারত ও চীনকে এই বিধানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে বিলটির আওতা সীমিত করার আলোচনায় ১০টি দেশের একটি তালিকাও প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব দেশ হলো—চীন, ভারত, তুরস্ক, আজারবাইজান, হাঙ্গেরি, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, সিঙ্গাপুর, স্লোভাকিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
অর্থাৎ বিলটি কার্যকর হলে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য অব্যাহত রাখা তৃতীয় কোনও দেশের ওপরও যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে পারবে।
রাশিয়ার জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতেও নিষেধাজ্ঞা
বিলটিতে শুধু রুশ তেল ও গ্যাসের ক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নেই। রাশিয়ার নেতৃত্ব, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান রাখা হয়েছে।
এছাড়া রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব জাহাজের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রুশ তেল পরিবহনে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে।
বিলের সমর্থকদের যুক্তি, রাশিয়ার জ্বালানি রফতানি থেকে আয় কমানো গেলে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে মস্কোর অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।
ট্রাম্পের শুল্কক্ষমতা নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের বিভাজন
তবে প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। ইউক্রেনকে সমর্থন করেন এমন কয়েকজন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাও ট্রাম্পের হাতে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়ার বিরোধিতা করছেন।
হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট গ্রেগরি মিকস বিলটির বিরোধিতা করে বলেন, এটি পর্যাপ্ত সুরক্ষা বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছাড়াই ট্রাম্পকে ব্যাপক শুল্কক্ষমতা দিতে পারে।
মিকস, কংগ্রেসের জয়েন্ট ইকোনমিক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট ডন বেয়ার এবং হাউস ওয়েজ অ্যান্ড মিনস কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট রিচার্ড নিল মনে করেন, প্রস্তাবিত ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করতে পারে।
তাদের যুক্তি, বিলটি প্রেসিডেন্টের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়াবে, অথচ রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপকে বাধ্যতামূলক করবে না। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে এবং ইউক্রেনের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি সমর্থনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রিচার্ড নিল বলেন, ট্রাম্প এর আগে কানাডা ও মেক্সিকোর মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপরও শুল্ক ব্যবহার করেছেন। ফলে প্রেসিডেন্টের হাতে আরও বিস্তৃত শুল্কক্ষমতা দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অতিরিক্ত সতর্কতার প্রয়োজন দেখছেন।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে চাপ বাড়ানো নিয়েও বিতর্ক
বিলটির সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে আরেকটি বড় বিতর্ক হলো—প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হলেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কতটা বাধ্যতামূলক হবে।
বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের মতে, প্রেসিডেন্টের হাতে বড় ধরনের শুল্কক্ষমতা তুলে দেওয়া হলেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞাগুলো বাধ্যতামূলক না হলে আইনটির মূল উদ্দেশ্য দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে বিলটির সমর্থকেরা মনে করছেন, এই ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে রাশিয়ার জ্বালানি আয়ের ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য কার্যকর একটি হাতিয়ার দেবে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নীতিতে এ ধরনের মাধ্যমিক ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরাসরি রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি রুশ জ্বালানি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত তৃতীয় দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকেও চাপে রাখার চেষ্টা এর লক্ষ্য।
রিপাবলিকানদের মধ্যেও আপত্তি
বিলটি শুধু ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেই বিতর্ক তৈরি করেনি। ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততা নিয়ে সংশয়ী কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও এর বিরোধিতা করছেন।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি পাস করাতে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে বিলটির আওতা ও প্রেসিডেন্টের শুল্কক্ষমতা নিয়ে দলীয় পর্যায়ে আলোচনা ও দর-কষাকষি চলছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা লিন্ডা সানচেজও এ নিয়ে দলের ভেতরের মতবিরোধের সমালোচনা করেছেন। তার অবস্থান হলো, ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা উচিত; তবে একই সঙ্গে ট্রাম্পের হাতে অতিরিক্ত শুল্কক্ষমতা তুলে দেওয়ার বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ইউক্রেনের চাপ
এদিকে বিলটির অগ্রগতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইউক্রেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
সোমবার রাতে দেওয়া এক ভাষণে জেলেনস্কি বলেন, লিন্ডসে গ্রাহামের নিষেধাজ্ঞা বিলটি এখনও আইন হয়নি—এটি এখনও কেবল একটি বিল। তার মতে, বিলটি আইনে পরিণত করা গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়াশিংটনে চলমান ‘ইউক্রেন অ্যাকশন সামিট’-এও বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ইউক্রেনপন্থী বিভিন্ন সংগঠন মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কিয়েভের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন অব্যাহত রাখার পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের মন্ত্রিসভার সদস্য এবং দেশটির ভেটেরানস অ্যাফেয়ার্সমন্ত্রী ভিতালি কিমও রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও অর্থনৈতিক চাপের পক্ষে মত দিয়েছেন। তার মতে, রাশিয়ার অর্থনীতিকে সংকুচিত করার লক্ষ্যে নেওয়া নিষেধাজ্ঞা যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টায় সহায়ক হতে পারে।
পরবর্তী পদক্ষেপ কী
প্রতিনিধি পরিষদে চূড়ান্ত ভোটে বিলটি পাস হলে এটি ট্রাম্পের কাছে যাবে। প্রেসিডেন্ট স্বাক্ষর করলে প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের কাঠামো কার্যকর করার পথ খুলবে।
তবে বিলটির চূড়ান্ত রূপ, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু দেশগুলোর তালিকা এবং ট্রাম্প বাস্তবে এই ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করবেন—এসব বিষয়ে এখনও রাজনৈতিক ও আইনপ্রণয়ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
বিলটি কার্যকর হলে রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যের ওপর এর প্রভাব শুধু মস্কোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ভারত, চীনসহ রুশ তেলের বড় ক্রেতা দেশগুলোর ওপরও নতুন অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম, ওয়াশিংটনের মিত্রদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সমীকরণেও এর প্রভাব পড়তে পারে। সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস