ঢাকা
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম
মৎস্য উৎপাদন বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে : মৎস্য প্রতিমন্ত্রী আ’লীগকে রিফাইন করে রাজনীতিতে ফেরানোর চেষ্টা চলছে: গোলাম পরওয়ার মেধাকে কবর দেওয়ার উদ্যোগ নিলে নতুন আন্দোলন হবে: শফিকুর রহমান স্বস্তি ফেরেনি মাছ, মুরগি ও ডিমের বাজারে, বেকায়দায় নিম্নবিত্তরা ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার করা ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা করছে সরকার: চিফ হুইপ আগামী বছর পদ্মা ব্যারেজের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন: পানিসম্পদমন্ত্রী পনির খাওয়ার যত উপকারিতা বিলম্বিত চিকিৎসায় সংকটে স্ট্রোক ও হৃদরোগীরা হজ নিবন্ধন ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে রাজধানীতে পুলিশের অভিযানে গত ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৫৪২, মামলা ৫১টিটি
Advertise with us

জনগণের সম্পদ রক্ষা পবিত্র কর্তব্য

ডেস্ক রিপোর্ট
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬   ২২ বার পঠিত
জনগণের সম্পদ রক্ষা পবিত্র কর্তব্য

ছবি: ফাইল ছবি

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী :বিদ্যমান রাজনীতি দিয়ে দেশের কি কোনো উপকার হবে? এর জবাব ওই প্রশ্নটির ভিতরেই রয়েছে। এই রাজনীতির দ্বারা দেশের কোনো উপকার হয়নি, হবেও না। বরঞ্চ দুর্দশা বাড়বে, যেমনটা বাড়ছে। এই রাজনীতি পুরোনো ও পরিচিত। রাষ্ট্র বদলেছে, রাজনীতি বদলায়নি। যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় যাতায়াত করে তারা নিজেদের স্বার্থ দেখে, দেশের স্বার্থ দেখে না। দেশের সম্পদ যেটুকু আছে, সেটা তারা অতিদ্রুত নিজেদের করতলগত করে নিতে চায়। জনগণের মুক্তির কথা যখন আমরা বলি তখন ওই সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানার প্রশ্নটাই প্রথমে আসে, আসতে বাধ্য। আমাদের দেশ যে দরিদ্র তার কারণ সম্পদের অভাব নয়, কারণ সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানা না-থাকা এবং সম্পদ বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া।

দেশের খরচে আমরা মানুষকে শিক্ষিত করি, সেই শিক্ষিত মানুষের স্বপ্ন থাকে বিদেশে যাওয়ার, নয়তো দেশে থেকেই বিদেশি কোম্পানিতে চাকরি করার। এ ক্ষেত্রে যেটা ঘটে, তা হলো দেশের খরচে যে দক্ষতা তৈরি হয় তা দেশের কাজে লাগে না, ব্যয় হয় বিদেশিদের সম্পদ উৎপাদনে। তার চেয়েও যেটা নিষ্ঠুর তা হলো দেশের ভূমি, বন্দর, খনিজ সম্পদ বিদেশি নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া।

যাকে আমরা পরাধীনতা বলে জানি, তার ভিতরকার মূল ব্যাপারটাই ছিল আমাদের সম্পদের ওপর বিদেশিদের কর্তৃত্ব। বিদেশি শাসকরা এ দেশের কর্মচারী, চাকরবাকর, দালাল ইত্যাদি তৈরি করেছে। উদ্দেশ্য ছিল এদের সাহায্যে এখানে যে সম্পদ রয়েছে তা দখল করা। কাজটা পাঠান ও মোগলরা করেছে, পরে ইংরেজরা করেছে আরও জোরেশোরে। পাঠান ও মোগলদের পাচার করা সম্পদ তবু উপমহাদেশের ভিতরেই রয়ে গেছে; ইংরেজরা তা নিয়ে গেছে নিজেদের দেশে। খনিজ সম্পদ উত্তোলন, কলকারখানা স্থাপন, যান্ত্রিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা, এমনকি একসময়ে নীল, পরে পাট ও চা-এর উৎপাদন, সবকিছুর মালিকানা ইংরেজ শাসকদের হাতেই ছিল। এবং জাহাজ ভর্তি করে তারা সোনাদানা থেকে শুরু করে কত যে অর্থবিত্ত পাচার করেছে, তার হিসাব বের করা কঠিন। ফলে তারা যে পরিমাণ ধনী হয়েছে, আমরা ঠিক সেই পরিমাণেই নিঃস্ব হয়েছি। তাদের দেশে শিল্পবিপ্লব ঘটেছে এবং আমরা পরিণত হয়েছি তাদের আটকে পড়া ক্রেতায়।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মূল কারণ ছিল সম্পদের ওই মালিকানাই। ইংরেজের ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে যা ঘটেছে, তথাকথিত স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রেও তাই ঘটেছিল। পূর্ববঙ্গের সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব পূর্ববঙ্গবাসীর ছিল না, কর্তৃত্ব ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের। আমরা বলেছিলাম এ দেশের যা কিছু আছে, তা আমাদেরই থাকবে। ওই দাবির ব্যাপারে বাঙালিদের দৃঢ়তা দেখেই পাঞ্জাবি সেনাবাহিনী ক্ষেপে গেল এবং গণহত্যা শুরু করে দিল, নইলে বাঙালিদের সঙ্গে ওই রকমের বিপজ্জনক খেলায় তারা মত্ত হতে যাবে কেন?

যুদ্ধ শেষ হয়েছে। আমরা জয়ী হয়েছি, কিন্তু দেশের সম্পদের ওপর দেশবাসীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি? না, হয়নি। আর সেজন্যই তো দেশ যে দরিদ্র তার কারণ সম্পদের অভাব নয়, কারণ হচ্ছে সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানা না-থাকা এবং সম্পদ বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া।

যুদ্ধ শেষে আমরা জয়ী হয়েছি, কিন্তু দেশের সম্পদের ওপর দেশবাসীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি? না, হয়নি। ভারতে গঙ্গার ওপর ফারাক্কা ব্যারাজ তারা পাকিস্তানি আমলেই তৈরি করেছিল। সেটাকে চালু করল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরে; তার পরে দুদেশের মধ্যে পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তি হয়েছে বটে, কিন্তু চুক্তি কার্যকর হয়েছে এমনটা বলা যাবে না। তিস্তার পানি নিয়ে সমস্যা আছে। পরে আবার যুক্ত হলো টিপাই মুখে বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প। ভূগর্ভস্থ তেল ও গ্যাস নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে, কেননা ভূ-এলাকা তো একই, প্রকৃতি তাকে দুই রাষ্ট্রসীমায় বিভক্ত করেনি, যা করার রাজনীতিকরাই করেছেন।

চার দশক আগে ১৯৮৬ সালে ভারতসংলগ্ন পঞ্চগড়ে জ্বালানি তেলের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল, ১৯৮৯ সালে সেখানে ঢাকঢোল পিটিয়ে তেল উত্তোলন শুরু হয়, উদ্বোধন করেন স্বৈরশাসক এরশাদ। কিন্তু আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের এক সপ্তাহের মধ্যেই উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়। এখন সেখানে খনির চিহ্নমাত্র নেই, লোকে চাষবাস করছে, অথচ ভারত কিন্তু সেখান থেকে ঠিকই জ্বালানি তেল উত্তোলন করে চলেছে। ওপরে থাকার ওই সুবিধা। অনুরূপভাবে বাংলা ও আসাম সীমান্তে গ্যাসক্ষেত্রে যে ভয়ানক সব দুর্ঘটনা ঘটেছে, যাতে আমাদের এলাকার শত শত কোটি টাকার গ্যাসসম্পদ পুড়ে গেছে, সেগুলো দুর্ঘটনা নাকি ঘটনা, সে নিয়ে সন্দেহ আছে, কেননা সংলগ্ন এলাকায় ওপরের দিক থেকে ভারতে গ্যাস উত্তোলন সমানে চলছে। এশিয়া এনার্জি নামের একটি ভুয়া বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে আমাদের উত্তরাঞ্চলে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লার খনি খনন করে সেখানকার মানুষের স্থায়ী ক্ষতিসাধনের আয়োজন করা হয়েছিল, জনপ্রতিরোধের মুখে তা কার্যকর করা যায়নি। তবু তৎপরতার অবসান হয়নি।

সবশেষে উদ্যোগটি ছিল গভীর সমুদ্রে দুটি কোম্পানিকে গ্যাস উত্তোলনের জন্য ইজারা দেওয়া। উত্তোলিত গ্যাসের শতকরা ৮০ ভাগ কোম্পানি নিয়ে নেবে, বাকি ২০ ভাগ আমরা পাব, কিন্তু আমরা তা ব্যবহার করতে পারব না, কেননা দূর সমুদ্র থেকে গ্যাস সৈকতে আনার মতো পাইপলাইন তৈরির সামর্থ্য আমাদের নেই, যার ফলে ওই গ্যাসও উত্তোলনকারী কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিতে হবে। পরে আবার সেই গ্যাসই তাদের কাছ থেকেই এবং তাদের দ্বারা নির্ধারিত উচ্চমূল্যেই ক্রয় করতে হবে। সব মিলিয়ে অবস্থাটা দাঁড়াবে নাইজেরিয়ার মতো, যেখানে তেলের প্রাচুর্যই নাইজেরীয়দের জন্য দুর্ভাগ্য ডেকে এনেছে, এবং নাইজেরিয়া এখন বসবাসের দিক থেকে নিকৃষ্টতম দেশের একটিতে পরিণত হয়েছে।

সমুদ্রসীমা নিয়ে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরোধ ছিল। সে বিরোধের নিষ্পত্তি হয়েছে। যে এলাকাটি আমাদের বলে চিহ্নিত হয়েছে, সেখান থেকে গ্যাস উত্তোলনের জন্য বিদেশি কোম্পানিকে ডেকে আনা হচ্ছে। গ্যাস উত্তোলন অবশ্যই করতে হবে, না করলে আমরা জ্বালানি পাব কোথা থেকে, বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে কেমন করে, সার পাব কোথায়, ঘরে চুলা জ্বলবার উপায় কী; কিন্তু উত্তোলন করা চাই গ্যাসের ওপর এ দেশের মানুষের মালিকানার অধীনে, তার বাইরে নয়। নইলে স্বাধীনতার অর্থটা কী দাঁড়াবে?

গ্যাসসম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হবে একটা আত্মঘাতী কাজ। মার্কিনিদের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিও দেশের সার্বভৌমত্ববিরোধী। এ চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিরোধী দল পদে পদে সরকারের বিরোধিতা করে, কিন্তু এ ব্যাপারে দেখা যাচ্ছে তারা আশ্চর্যজনক নিশ্চুপ। বোঝা যাচ্ছে, দেশের সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যাপারে তারা একই পথের পথিক, যে পথ দেশের জন্য মঙ্গলজনক তো নয়ই, বরঞ্চ অত্যন্ত বিপজ্জনক।

কিন্তু ইতিহাস তো এসব কাজ আগেও ক্ষমা করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না। তবে সেই ভবিষ্যৎ আমরা পাব কী, যদি এখনই প্রতিরোধ গড়ে না তুলি? প্রতিরোধ না গড়লে একাত্তরেই আমরা শেষ হয়ে যেতাম। একাত্তর কিন্তু মিথ্যা নয়, সে বলছে মুক্তির সংগ্রাম চলবেই। এবং নিরাপত্তা অর্থে বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির বংশানুক্রমিক নিরাপত্তা নয়, চাই সমগ্র দেশবাসীর জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা।

এই নিরাপত্তার লক্ষ্যে সংগ্রাম করার জন্য বড় রাজনৈতিক দলকে মাঠে দেখা যাচ্ছে না; কিন্তু মানুষকে তো বাঁচতে হবে; তাই জনগণের সম্পদ রক্ষা করবে এমন রাজনৈতিক শক্তিকে বিকশিত করতে সচেষ্ট হওয়া দেশপ্রেমিক মানুষমাত্রেরই অবশ্যপালনীয়, কর্তব্য ও দায়িত্ব। এটা ভুললে যে ক্ষতিটা হবে, তা হবে অপূরণীয়।

♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us