ঢাকা
২৯ আগস্ট ২০২৬
Advertise with us

সমাজ পরিবর্তনে বাধা দেয় কে

ডেস্ক রিপোর্ট
শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬   ২০ বার পঠিত
সমাজ পরিবর্তনে বাধা দেয় কে

ছবি: সংগৃহীত

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : সমাজ পরিবর্তনের প্রতিবন্ধকতাটা সমাজের ভিতরেই থাকে; বাইরে থেকে যে বাধা আসে না তা নয়, অবশ্যই আসে; তবে মূল বিরোধিতাটা সক্রিয় থাকে সমাজের ভিতরেই। এ ব্যাপারটা নিয়ে আরও কথা বলার আগে অবশ্য পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার যে সমাজ পরিবর্তন বলতে কী বুঝি এবং পরিবর্তনটা কারা চায়। সমাজ পরিবর্তন মানে সমাজ সংস্কার নয়। সংস্কার মানে ত্রুটিবিচ্যুতির সংশোধন, আর সমাজ পরিবর্তন যেটা দাবি করে তা হলো সমাজের ভিতরে যে যন্ত্রটা আছে শোষণের, তাকে সমূলে উৎপাটিত করে সমাজের অন্তর্গত মানুষের সঙ্গে মানুষের মানবিক সম্পর্ক স্থাপন করা। দুইয়ের ভিতর ব্যবধানটা দিন ও রাতের। সমাজ বদলের কাজটা সহজ নয়, যে জন্য সমাজ বদলেও বদলায় না। অন্য বিপ্লব তো বটেই, রাষ্ট্র বিপ্লবও ঘটে যায়, কিন্তু ঝড়ের শেষে দেখা যায় অনেক কিছুই বদলেছে বৈকি, কিন্তু সমাজ রয়ে গেছে মোটামুটি সেই আগের মতোই, যে ব্যবস্থায় অল্প মানুষ শোষণ করত অধিক মানুষকে, তাতে পরিবর্তন আসেনি।

মূলকথাটা হলো মানুষের মুক্তি। সেই মুক্তির জন্যই রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার মানেই যে মানুষের মুক্তি নয়, তার প্রমাণ তো আমরা হাতেনাতেই পেয়ে গেছি। একবার পেলাম সাতচল্লিশের পরে, আরেকবার পাওয়া গেল একাত্তরের পরে। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা আমরা কেন চেয়েছিলাম? একদল শাসক চলে যাবে, তাদের শূন্য আসনে আরেক দল শাসক বসে পড়বে, ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটবে, কিন্তু ক্ষমতার নিষ্পেষণকারী চরিত্র অক্ষুণ্ন থাকবে, নিশ্চয়ই এটা আমাদের কাঙ্ক্ষিত ছিল না। আমরা চেয়েছিলাম মুক্তি; যে মুক্তি কেবল সামাজিকভাবেই ঘটতে পারে। কেননা মানুষ সমাজেই বসবাস করে, যদিও তাকে থাকতে হয় রাষ্ট্রের অধীনেই। আর এই যে সমাজ সমাজ করছি আমরা, তা সমাজ জিনিসটাই বা কী? জবাবে বলা যায়, সমাজ আসলে অন্যকিছু নয়, সমাজ হচ্ছে সামাজিক সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের বদল চেয়েছিলাম আমরা, অর্থাৎ মুক্তি চেয়েছিলাম শোষক-শোষিতের অতিপুরোনো সম্পর্কের নিগড় থেকে। রাষ্ট্র ওই সম্পর্কের পাহারাদার ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করছিল, যেজন্য রাষ্ট্র ভাঙার দরকার ছিল। রাষ্ট্র ভেঙেছে ঠিকই, কিন্তু তার চরিত্র বদলায়নি, মানুষের ওপর মানুষের শোষণকে সে অহর্নিশ পাহারা দিয়ে যাচ্ছে। বীভৎস ও অজস্র চক্ষু এক দৈত্যের মতো।

এই যে কাঙ্ক্ষিত সমাজ পরিবর্তন তার পথে বাধাটা সমাজের ভিতর থেকেই আসে। তারা তো বাধা দেবেই বিদ্যমান ব্যবস্থা থেকে, যারা সুযোগসুবিধা পায় এবং পেতে থাকবে বলে আশা রাখে। তাদের কায়েমি স্বার্থ তারা রক্ষা করতে চাইবে। প্রয়োজনে তারা এমনকি সমাজ বিপ্লবের রণধ্বনি তুলবে, কিন্তু চোখটা থাকবে ওই বোচকার দিকেই, অর্থাৎ শোষণের যন্ত্রটাকে রক্ষা করার দিকেই, এবং সেটাই ঘটছে। কিন্তু যারা বঞ্চিত তারাও সবাই যে সমাজের পরিবর্তন চায় এটা কিন্তু সত্য নয়। চাইবার কথা, কিন্তু চায় না। না-চাওয়ার কারণ আছে। প্রথমত অভ্যাস; বিদ্যমান সমাজব্যবস্থায় তারা অভ্যস্ত হয়ে গেছে, এর বদল ঘটলে যে তাদের জীবনপ্রবাহ অনর্গল হয়ে যাবে এবং জীবনে সুখশান্তির জোয়ার আসবে এমনটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ তারা দেখে না; বরং উল্টোটাই তারা দেখে এসেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনে তারা ভূমিকা রেখেছে, দুর্ভোগ সহ্য করেছে; কিন্তু পরিণামে দেখেছে যে বিপদ যা ঘটার তাদের ওপর দিয়েই গেছে। পরিবর্তনের কথা শুনলে তারা বরং ভয়ই পায়, আশঙ্কা করে যে অবস্থা তো ভালো হবেই না, আরও খারাপ হবে। দ্বিতীয়ত বহু যুগের অভিজ্ঞতা ও সমাজের কর্তৃত্বকারী মানুষদের প্রচারণা ও তাদের প্রদত্ত শিক্ষা থেকে সাধারণ মানুষ ধরেই নিয়েছে, যা ঘটছে সেটাই স্বাভাবিক, এটাই তাদের ভাগ্য ও বিধিলিপি, এর রদবদল হবে না এবং হওয়ারও নয়। তাই যা আছে তাকে মেনে নিয়ে কীভাবে জীবনটাকে ধরে রাখা যায় সে চেষ্টা করাটা ভালো।

এদিকে সমাজে কি কোনো উন্নতি হয়নি? অবশ্যই হয়েছে। কিছু লোক অবিশ্বাস্য দ্রুততায় অসম্ভব উন্নতি করেছে। আর দেশের চতুর্দিকে যেসব উন্নতির চিহ্ন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে তার প্রায় সবটাই এদের সুবিধায় লাগছে।

এদের সংখ্যা অল্প, এই অল্পসংখ্যকের যত উন্নতি, বাদবাকিদের ততই অবনতি, এটাই হচ্ছে সমাজবাস্তবতা। কেননা বহু মানুষের কাঁধে চড়েই অল্প মানুষের এই ওপরে ওঠা; এই উন্নতি করা।

এই যে অভূতপূর্ব উন্নতি, এটাই কিন্তু সমাজ পরিবর্তনের ব্যাপারে আজ মূল প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যত উন্নতি ঘটছে ততই বাড়ছে মানুষের সঙ্গে মানুষের বৈষম্য এবং বিচ্ছিন্নতা। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উন্নয়নের অপর কোনো অর্থ নেই; পরিচ্ছন্ন অর্থটা হলো যত উন্নতি ঘটবে তত বাড়বে বৈষম্য। কেননা ওই যে বহুজনকে বঞ্চিত করা ওটাই তো হলো উন্নতির আসল ভিত্তি। এই উন্নতি আরেকটা কাজও সমান তেজে ও দক্ষতায় করে চলেছে; সেটা হলো মানুষের সঙ্গে মানুষের বিচ্ছিন্নতা বৃদ্ধি, অর্থাৎ কিনা যথার্থ সামাজিকতার ধ্বংসসাধন। উন্নয়নের সর্বগ্রাসী প্রক্রিয়াতে আবদ্ধ মানুষ প্রত্যেকে কেবল নিজের কথা ভাবে এবং এমন হয়ে দাঁড়ায় ব্যক্তির অবস্থা যে নিতান্ত আপনজনকেও প্রতিদ্বন্দ্বী তো বটেই, এমনকি শত্রু বলেও ধারণা জন্মায়। তার যাত্রা ঘটে আদিম ও বন্য বিচ্ছিন্নতার অভিমুখে।

সমাজে আজকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা সবকিছুই বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে সম্পদ আহরণের প্রধান উপায়। চাকরি, পেশাজীবন, সবই এখন এক ধরনের ব্যবসা বটে। আর ওই যে দুর্নীতির আকাশচুম্বী বিস্তার তাকে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না; নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যারা সচেষ্ট হচ্ছে তারা দিশাহারা হয়ে পড়ছে। তার কারণ হলো সবই এখন পণ্য, বাজারে কেনা যায়; আর যার টাকা আছে তার কোনো অসুবিধা নেই, সুবিধাগুলো তার জন্য অপেক্ষমাণ। ব্যবসা থাকবে অথচ দুর্নীতি থাকবে না, এটা হয় না, হচ্ছেও না। কোনোখানেই আজ জবাবদিহির কোনো দায় নেই, দায়িত্ব নেই। সবাই টাকায় কেনা গোলামে পরিণত হয়েছে। পুঁজিবাদের বাস্তবতা ও আদর্শবাদ ক্ষোভের সৃষ্টি করছে। অধিকাংশ মানুষই আজ ক্ষুব্ধ, অসন্তোষ দিকে দিকে ফুঁসে উঠছে। কেননা মানুষ সামনে কোনো আশা দেখতে পাচ্ছে না। উন্নতির দৈত্য মানুষের সব আশা কেড়ে নিয়েছে, সব স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে। সমষ্টিগত মুক্তির স্বপ্নটা এখন আর সামনে নেই। মানুষের আস্থা নেই। তার জীবন এখন স্পষ্ট হচ্ছে বেঁচে থাকার কঠিন দুঃস্বপ্ন। উন্নতির প্লাবন মানুষকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন প্রাণীতে পরিণত করতে চাইছে। বেকার সমস্যা বাড়ছে। হরেক আশাজাগানিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা বলেছিল সব মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করবে। মানুষের জন্য কর্মের সংস্থান করবে, তারাই এখন বিপরীত পথে হাঁটছে। সেটা সব শাসকের ক্ষেত্রে দেখার অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে। প্রকৃত দোষটা সরকারের নয়, দোষটা পুঁজিবাদেরই। সেই নিষ্ঠুর শত্রু সরকারকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে বাধ্য করবে তো বটেই, ঘাড়ে ধরে তাকে সম্পূর্ণ উল্টো পথে পরিচালিত করছে। বিনিয়োগ বাড়ছে না। বাড়বে যে তার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। কেননা এ দেশের পুঁজিবাদীরা উৎপাদনে বিশ্বাস করে না, তারা আস্থা রাখে লুণ্ঠনে। রাষ্ট্রের যারা কর্তৃপক্ষ, রাজনীতিক, অসামরিক ও সামরিক আমলা, তারাও একই আদর্শে অসংশোধনীয় রূপে দীক্ষিত অবস্থায় রয়েছেন। ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের উৎসাহ দেওয়া হয় না, বরং আতঙ্কের মধ্যে রাখা হয় নিত্যনতুন কর্তনের।

♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us