ছবি: সংগৃহীত
গর্ভাবস্থায় ভারী কিছু তুলতে দেখলে অনেকেরই প্রথম চিন্তা হয়, এতে মা ও গর্ভের শিশুর কোনো ক্ষতি হবে কি না। তবে নতুন এক গবেষণা বলছে, চিকিৎসকের পরামর্শ ও উপযুক্ত নিয়ম মেনে করা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম গর্ভবতী নারীর জন্য শুধু শরীরের শক্তি বাড়াতেই নয়, মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার ক্ষেত্রেও উপকারী হতে পারে। এমনকি গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমারও ইঙ্গিত মিলেছে।
স্পেনের সান সেবাস্তিয়ানের হাসপাতাল ইউনিভার্সিতারিও দোনোস্তিয়ার গবেষক তেরেসা ই সান্তা ক্রুজের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Acta Obstetricia et Gynecologica Scandinavica জার্নালে।
গবেষণায় অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা থাকা ২০৯ জন গর্ভবতী নারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁদের একদলকে শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের কর্মসূচিতে রাখা হয়, অন্যদলকে দেওয়া হয় স্বাভাবিক প্রসবপূর্ব পরিচর্যা।
গর্ভাবস্থার ১২ থেকে ১৪ সপ্তাহের দিকে ব্যায়াম শুরু করা হয়। সন্তান জন্ম দেওয়া অথবা গর্ভাবস্থার ৩৬ সপ্তাহ পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলে। এতে সপ্তাহে একবার প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ব্যায়ামের পাশাপাশি বাড়িতে ব্যায়াম করার সুযোগ ছিল। অংশগ্রহণকারীদের সপ্তাহে তিন দিন হালকা ওজন বা রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড ব্যবহার করে ব্যায়াম করতে উৎসাহিত করা হয়।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে গবেষণায় দেখা যায়, ব্যায়াম করা দলের ২ শতাংশ নারী এ সমস্যায় আক্রান্ত হন। অন্যদিকে স্বাভাবিক প্রসবপূর্ব পরিচর্যা নেওয়া দলের ৭ দশমিক ৩ শতাংশ নারীর গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হয়। তবে দুই দলের পার্থক্য পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল না। ফলে শুধু এই গবেষণার ভিত্তিতে ব্যায়াম গর্ভকালীন ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করে, এমন সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছে না।
তবে যারা নিয়ম মেনে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন ব্যায়াম করেছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হননি। গবেষকেরা অবশ্য সতর্ক করে বলেছেন, এই অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কম হওয়ায় এ ফলাফলকে ব্যায়ামের মাধ্যমে ডায়াবেটিস প্রতিরোধের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না।
গর্ভাবস্থায় বাংলাদেশের মায়েদেরও নানা শারীরিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এ সময় বমিভাব, অতিরিক্ত ক্লান্তি, কোমর ও শ্রোণিতে ব্যথা, উদ্বেগসহ বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসও মায়েদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি। এসব কারণে গর্ভাবস্থায় শরীরচর্চা করা যাবে কি না, তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই সংশয় থাকে।
নতুন গবেষণায় অবশ্য শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের সঙ্গে এসব সমস্যার কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ব্যায়াম করা নারীরা তুলনামূলক ভালো জীবনমানের কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ, ক্লান্তি এবং কোমর ও শ্রোণির ব্যথার মতো গর্ভাবস্থার উপসর্গও কম ছিল।
গবেষণায় ব্যায়ামের কারণে গর্ভপাত বা সময়ের আগে সন্তান জন্ম দেওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। দুই দলের মধ্যে সময়ের আগে সন্তান জন্ম এবং গর্ভপাতের হারও প্রায় একই ছিল।
গবেষণাটির সংশ্লিষ্ট লেখক তেরেসা ই সান্তা ক্রুজ বলেন, গর্ভাবস্থায় নিয়ম মেনে পরিচালিত শক্তিবর্ধক ব্যায়াম কর্মসূচি গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে এবং মায়ের সুস্থতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে গর্ভাবস্থার নিয়মিত পরিচর্যায় কীভাবে শক্তিবর্ধক ব্যায়াম সবচেয়ে ভালোভাবে যুক্ত করা যায়, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
গর্ভাবস্থায় ব্যায়াম শুরু করার আগে মায়ের শারীরিক অবস্থা ও গর্ভাবস্থার ঝুঁকি বিবেচনা করা জরুরি। তাই নিজের মতো করে ভারী ওজন তোলার পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রশিক্ষিত ব্যক্তির নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যায়াম করাই গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: ইউরো নিউজ