ঢাকা
০৭ আগস্ট ২০২৬
Advertise with us

সন্তান প্রতিপালনে ইসলামের নীতিমালা

ডেস্ক রিপোর্ট
শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬   ৯ বার পঠিত
সন্তান প্রতিপালনে ইসলামের নীতিমালা

ছবি: সংগৃহীত

মুফতি মুহাম্মদ আনিসুর রহমান রিজভি :একটি শিশুর জন্ম শুধু একটি পরিবারের আনন্দের উপলক্ষ নয়; বরং একটি জাতির ভবিষ্যতের সূচনা। আজকের কোলের শিশুই আগামী দিনের আলেম, শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রনায়ক কিংবা সমাজসংস্কারক।

আবার যথাযথ পরিচর্যা ও নৈতিক শিক্ষার অভাবে সেই শিশুই একসময় সমাজের জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারে। তাই ইসলাম সন্তানকে শুধু জন্ম দেওয়ার শিক্ষা দেয়নি; বরং তাকে ঈমান, তাকওয়া, জ্ঞান, আদব-আখলাক ও মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা উপহার দিয়েছে।

আদর্শ সমাজ গড়ার সূচনা হয় আদর্শ পরিবার: আজ যখন পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে, কিশোর অপরাধ বাড়ছে, মাদক, অশ্লীলতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার ও মূল্যবোধের অবক্ষয় সমাজকে গ্রাস করছে, তখন ইসলামের সন্তান প্রতিপালন নীতি নতুন করে আমাদের সামনে আলোর দিশা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ একটি আদর্শ সমাজ গড়ার সূচনা হয় আদর্শ পরিবার থেকে, আর আদর্শ পরিবারের ভিত্তি হলো সুশিক্ষিত ও নেককার সন্তান।

মহান আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।’ (সুরা : আত-তাহরিম, আয়াত : ৬)

এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়— সন্তানের খাদ্য, পোশাক ও শিক্ষার ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট নয়; বরং তার ঈমান, আমল, চরিত্র ও আখিরাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও পিতা-মাতার অন্যতম ফরজ দায়িত্ব।

সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহামূল্যবান আমানত: ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তান সম্পদ নয়, অহংকারের বিষয়ও নয়; বরং আল্লাহর অর্পিত একটি মহামূল্যবান আমানত। এই আমানতের যথাযথ হক আদায় করতে পারলে তা দুনিয়ায় প্রশান্তি এবং আখিরাতে মুক্তির কারণ হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের শোভা। আর স্থায়ী সৎকর্মই তোমার রবের কাছে উত্তম প্রতিদান ও উত্তম আশা।’
(সুরা : আল-কাহফ, আয়াত : ৪৬)

অতএব সন্তানকে শুধু উচ্চশিক্ষিত বা প্রতিষ্ঠিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই যথেষ্ট নয়; বরং আল্লাহভীরু, সত্যবাদী, সৎ ও আদর্শবান মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলাই প্রকৃত সফলতা।

নেক সন্তান লাভের দোয়া: নেক সন্তান লাভের সূচনা হয় দোয়া ও তাকওয়া থেকে। সন্তান প্রতিপালনের প্রথম ধাপ শুরু হয় তার জন্মেরও আগে।

ইসলাম সৎ জীবনসঙ্গী নির্বাচন, হালাল জীবিকা এবং নেক সন্তানের জন্য আন্তরিক দোয়ার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কোরআনে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের দোয়া, ‘হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন এবং আমাদেরকে মুত্তাকিদের নেতা বানিয়ে দিন।’
(সুরা : আল-ফুরকান, আয়াত : ৭৪)

যে পরিবার আল্লাহর কাছে নেক সন্তানের জন্য প্রার্থনা করে এবং নিজেদের জীবনও ইসলামের আলোকে পরিচালিত করে, সে পরিবারের সন্তানদের মধ্যেই আদর্শ চরিত্র গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বেশি।

সন্তান মানুষ করা শুধু দায়িত্ব নয়, বরং ইবাদত: সন্তানের মুখে প্রথমে তাওহিদের বাণী, তারপর কোরআনের শিক্ষা, এরপর সালাত, আদব-আখলাক ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা—এটাই ইসলামের শিক্ষাপদ্ধতি। লুকমান (আ.)-এর নসিহত আজও প্রতিটি পিতা-মাতার জন্য অনুকরণীয়। তিনি বলেছিলেন, ‘হে আমার প্রিয় সন্তান! আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক কোরো না। নিশ্চয়ই শিরক মহা জুলুম।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে সালাতের নির্দেশ দাও।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৫)

এ শিক্ষা প্রমাণ করে, সন্তানকে দ্বিনের পথে পরিচালিত করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়; বরং এটি একটি মহান ইবাদত।

আদর্শ পিতা-মাতাই সন্তানের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক: সন্তান উপদেশের চেয়ে অনুকরণ বেশি করে। তাই পিতা-মাতার প্রতিটি আচরণ সন্তানের ব্যক্তিত্ব গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। ঘরে যদি সত্যবাদিতা, সালাত, কোরআন তিলাওয়াত, বিনয়, শালীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের পরিবেশ থাকে, তবে সন্তানও সেসব গুণ স্বাভাবিকভাবেই অর্জন করবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)

প্রযুক্তির যুগে নতুন চ্যালেঞ্জ: বর্তমান সময়ে সন্তানের হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া সহজ; কিন্তু তার বিবেক, ঈমান ও চরিত্র রক্ষা করা কঠিন। ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অনলাইন গেম, অশ্লীল কনটেন্ট ও ভার্চুয়াল আসক্তি শিশু-কিশোরদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই প্রযুক্তি নিষিদ্ধ নয়; বরং এর সঠিক ব্যবহার শেখানোই ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা।

সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার: সন্তানদের প্রতি সমান ভালোবাসা ও ন্যায়বিচার ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। বৈষম্য পারিবারিক অশান্তি ও হিংসার জন্ম দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো। (বুখারি, হাদিস : ২৫৮৭; মুসলিম, হাদিস : ১৬২৩)

হালাল রিজিক নেক সন্তানের ভিত্তি: সন্তানের মুখে যে আহার তুলে দেওয়া হয়, তা তার দেহের পাশাপাশি চরিত্র ও আত্মাকেও প্রভাবিত করে। তাই হালাল উপার্জন, হালাল খাদ্য এবং পবিত্র পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রতিটি মুসলিম অভিভাবকের অন্যতম দায়িত্ব।

মনে রাখতে হবে, সন্তানদের জন্য রেখে যাওয়া সর্বশ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার ধন-সম্পদ নয়; বরং বিশুদ্ধ ঈমান, সচ্চরিত্র, ইসলামী আদর্শ ও উত্তম শিক্ষা। যে পরিবার এই নীতিমালার আলোকে সন্তানকে গড়ে তুলবে, সেই পরিবার হবে শান্তির নীড়, সেই সমাজ হবে নৈতিকতায় সমৃদ্ধ এবং সেই জাতি হবে আল্লাহর রহমত ও বরকতের অধিকারী। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্তানকে শুধু সফল মানুষ নয়, বরং আল্লাহভীরু, চরিত্রবান, মানবকল্যাণে নিবেদিত এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসারী আদর্শ মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন।

লেখক: প্রভাষক (আরবি),  মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম ।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us