ঢাকা
০৭ আগস্ট ২০২৬
Advertise with us

প্রতিরোধ অত্যাবশ্যক সেটা অস্বীকার করা যাবে না

ডেস্ক রিপোর্ট
শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬   ১২ বার পঠিত
প্রতিরোধ অত্যাবশ্যক সেটা অস্বীকার করা যাবে না

ছবি: সংগৃহীত

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আগস্ট মাসের ৫ তারিখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে যে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল সমাজ-পরিবর্তনে বিশ্বাসী বামপন্থিদের কর্তব্য ছিল সেটি পূরণ করে বুর্জোয়াদের বিকল্প শক্তি হিসেবে দৃশ্যমান হওয়া এবং দেশবাসীকে আশা দেওয়া যে সত্যিকারের পরিবর্তন সদ্য না ঘটলেও আগামীকাল ঘটবে। ওই কাজের জন্য আবশ্যক ছিল একটি সমাজ বিপ্লবী যুক্তফ্রন্ট গঠন। অনেক দেরিতে হলেও শেষ পর্যন্ত একটি যুক্তফ্রন্ট গঠনে তাঁরা সম্মত হলেন ঠিকই, কিন্তু দেখা গেল সেটি বিপ্লবী আন্দোলনের যুক্তফ্রন্ট না হয়ে রূপ নিয়েছে নির্বাচনি জোটে। বামপন্থিরা তৎপর হলেন বুর্জোয়াদের সঙ্গে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।

কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় নির্বাচন যে বুর্জোয়াদের ক্ষমতা ভাগাভাগির লড়াই ছাড়া অন্য কিছু নয় এবং সেখানে যে বুর্জোয়া ভিন্ন অন্য কারও প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ সেই স্থূল বাস্তবতাটাকে বোঝার মতো বিবেচনার অভাবের কারণে কি না জানি না, বামপন্থি জোটের শরিকরা নিজ নিজ পরিচয়ে নির্বাচন-যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে জামানত হারানো তো সামান্য ব্যাপার, এমন করুণ সংখ্যক ভোট পেলেন যেটার গুরুভারে তাঁরা নিজেরাই এখন বিব্রত; হয়তো লজ্জিতও, নিজেদের কাছেই। সমাজতন্ত্রীরা বুর্জোয়াদের চেয়েও অধিক তীক্ষè বুদ্ধির অধিকারী হবেন এটাই প্রত্যাশিত, নির্বুদ্ধিতা আর যাদেরই সাজুক সমাজতন্ত্রীদের সাজে না। যাই হোক, নির্বাচনের পরে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী একটি জোট যে তাঁরা শেষমেশ গঠন করেছেন সেজন্য তাঁদের অভিনন্দন এবং সামনে যেহেতু কোনো সংসদীয় নির্বাচন নেই তাই তাঁরা আন্দোলনেই থাকবেন এমনটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সামাজিক বিপ্লব সম্ভব নয়, এটা তো ঐতিহাসিকভাবেই প্রমাণিত এবং এখন বিশ্বজুড়ে সত্য বলে প্রতিভাত। এমনকি অভ্যুত্থানও যে বিপ্লবী চরিত্র গ্রহণ করবে না, যদি না লক্ষ্যটা হয় সমাজ বিপ্লবী, এটাও তো খুবই মোটা দাগের একটি সত্য।

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি প্রায়ই উচ্চকণ্ঠে উচ্চারিত হয়, হতে থাকে। সার্বভৌমত্বের একটা পরীক্ষা ঘটে সীমান্তে। ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়াটাই যুক্তিসংগত; ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী এবং বাংলাদেশে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ভারতের সহায়তা ছিল যেমন প্রয়োজনীয় তেমনি ফলপ্রসূ। কিন্তু সীমান্তে সংঘর্ষ থামে তো নয়ই, সহসা যে থামবে এমন লক্ষণও নেই। বরং বাড়ছেই। বাংলাদেশের নাগরিক বলে অভিযুক্ত করে ভারত থেকে মানুষকে সীমান্ত দিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এবং জোর করে ঠেলে পাঠানোর অমানবিক তৎপরতা সমানে চলছে। এ ব্যাপারে ভারতের হিন্দুত্ববাদী বর্তমান সরকারের উৎসাহ অত্যন্ত প্রবল, মিয়ানমার যেমনটা করছে পারলে তেমনটাই করে। উদ্দেশ্য নিজ দেশের মানুষের শ্রেণি-সচেতনতা, গরিব মানুষের দুর্দশা বৃদ্ধি, শিক্ষিত মানুষের বেকারত্ব, কৃষক-বিক্ষোভ-এরকম নানা সমস্যা ধামাচাপা দেওয়া।

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কেবল যে ভৌগোলিক সীমান্তে পরীক্ষিত হয় তা তো নয়, প্রতিনিয়ত তার পরীক্ষা চলে রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনাতেও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার যে অত্যন্ত অসম বাণিজ্য চুক্তিটি স্বাক্ষর করে রেখে গেছে অন্য অনেক ক্ষতির সঙ্গে সেটি যে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ করবে সেটা মোটেই অপরিষ্কার নয়। প্রতিবাদ হচ্ছে; বামপন্থিরা করছেন, দেশপ্রেমিক সংগঠনগুলোও করছে, কিন্তু এ ব্যাপারে জাতীয় সংসদে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। সরকারি দল নিশ্চুপ, বিরোধী দলও সাড়াশব্দহীন। প্রতিবাদ তো নয়ই, এমনকি বৈদেশিক চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ সংসদে উপস্থাপনের যে সাংবিধানিক আবশ্যিকতা রয়েছে সেটি মান্য করার দাবিটুকুও সংসদীয় দুই মহলের কোনোটির পক্ষ থেকেই তোলা হয়নি। তাতে সেই প্রমাণিত সত্যটিরই নবতর পরিচয় পাওয়া যায় যে, দুই পক্ষের ভিতর আত্মীয়তাটা অতিঘনিষ্ঠ- ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের এবং তাঁদের যে ঝগড়া সেটাও ভ্রাতৃকলহের অধিক কিছু নয়।

যাদের সুবিধার জন্য সাতচল্লিশ সালে দেশভাগ করা হয়েছিল রাষ্ট্রক্ষমতায় কিন্তু ধারাবাহিকভাবে তাঁদেরই অধিষ্ঠান; যদিও নামে, পোশাকে, গলার আওয়াজে তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন। তাঁদেরই একাংশ এখন কেন্দ্রে বসে সমগ্র ভারত রাষ্ট্রকে শাসন করছে এবং নানাবিধ প্রচেষ্টা, ছলনা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দুষ্ট ব্যবহারের সাহায্যে সাম্প্রদায়িকতাকে প্রবেশাধিকার না-দেওয়ার ব্যাপারে যে পশ্চিমবঙ্গ এত দিন ধরে অত্যন্ত দৃঢ় ছিল শেষ পর্যন্ত সেই রাজ্যটিকেও তারা আপাতত দখল করে ফেলেছে। বর্তমান শাসনকর্তাদের হটিয়ে পরবর্তীতে আরেক দল ক্ষমতায় আসতে পারে, কিন্তু তাঁরা যে জনগণের পক্ষের দল হবে তেমন সম্ভাবনা নেই। রাষ্ট্র শাসনের যে-ব্যবস্থাটা প্রতিষ্ঠিত তাতে বুর্জোয়াদেরই একাংশ অপরাংশকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসা-যাওয়া করতে থাকবে। তবে বিজেপির শাসনামলে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান সম্প্রদায়ই কেবল নয়, মেহনতি মানুষেরও বিপদ যে বাড়বে তার লক্ষণ ইতোমধ্যে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। বহুতলা দালান তোলার বাসনায় ‘বুলডোজার নীতি’ চালিয়ে বস্তি নির্মূল করা হচ্ছে। হকারদের উচ্ছেদের কাজ চলছে শহরের সৌন্দর্যবর্ধনের নাম করে। গরু কোরবানি কার্যত নিষিদ্ধ করায় যে খামারিরা গরু লালনপালন করে জীবনধারণ করতেন তাঁদের মাথায় বজ্রাঘাত ঘটেছে। বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে দেওয়ার প্রাথমিক কাজটি কিন্তু স্বয়ং মমতা ব্যানার্জিই করেছিলেন, গেরুয়াধারীদের দৌরাত্ম্যে এখন তিনিই ভুক্তভোগী হচ্ছেন। বুর্জোয়াদের রাজনীতির চরিত্রটা অসংশোধনীয় রূপে ওই ধরনেরই।

নির্বাচন বাংলাদেশেও হয়েছে এবং সেখানেও যেমনটা ঘটা স্বাভাবিক তেমনটাই ঘটেছে। বুর্জোয়ারাই জিতেছেন। যাঁরা সরকার গঠন করেছেন এবং যাঁরা বিরোধী দলের আসনে আসীন হয়েছেন তাঁরা কিছুদিন আগেও এক সঙ্গেই ছিলেন, রীতিমতো জোট বেঁধে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা তখন ছিল বিএনপি-জামায়াত জোটের সঙ্গে আওয়ামী লীগের। আওয়ামী লীগ এখন নেই, তাই লড়াইটা বেধেছে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের। দুটোই বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক দল- একটির পরিচিতি উদারনীতিক হিসেবে, অপরটি ঘোষিত রূপেই কট্টর দক্ষিণপন্থি; তফাৎ ওইটুকুই; তার বাইরে তাঁরা উভয়েই সম্পদের ব্যক্তিমালিকানার তথা পুঁজিবাদেরই সমর্থক এবং সামাজিক মালিকানার ঘোরতর বিরোধী। এককথায় বলতে গেলে, উভয়েই পুঁজিবাদী উন্নয়নের আদর্শে দীক্ষিত, যে কারণে তাঁদের পক্ষে জোট বাঁধা কোনো বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল না।

জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্ররা যে একটি রাজনৈতিক দল গঠনে উদ্যোগী হবেন সেটা তাঁদের আচরণই বলে দিচ্ছিল। সেটি তাঁরা গঠন করেছেনও। ওই তরুণদের আওয়াজ ছিল নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কায়েম করার, রাষ্ট্রব্যবস্থায় এমন সব সংস্কার নিয়ে আসার যেগুলো হবে রীতিমতো বৈপ্লবিক। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল তাঁদের আস্ফালিত বন্দোবস্তটা দাঁড়িয়েছে অতি পুরোনো জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধা। এবং তাঁদের সংস্কারসূচি যে জামায়াতের অনুমোদনের বাইরে যাবে না সেটাও স্বচ্ছ পানির মতোই পরিষ্কার।

বাণিজ্যি চুক্তিতে বাণিজ্যের কথাই বলা হয়েছে, কিন্তু অসম বাণিজ্য যে কী বস্তু সেটা তো আমরা উপমহাদেশের মানুষ ইংরেজ বণিকদের আগমনের পরেই টের পেয়েছিলাম। ইংরেজদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্য দিয়েই শুরু করে এবং বাণিজ্যপথেই আস্ত ও মস্ত একটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। আমেরিকা পুরোনো পদ্ধতিতে শারীরিকভাবে আসবে না, কিন্তু বাণিজ্য চুক্তির যেসব শর্ত বাংলাদেশকে মানতে বাধ্য করবে তাতে দ্বিপাক্ষিকতা নগণ্য, সমস্তটাই একপাক্ষিক। দেশের অল্প ক্ষেত্রই থাকবে যেখানে এই চুক্তির ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না।  বলাই বাহুল্য, সর্বাধিক ক্ষতিটা হবে মেহনতি মানুষের। কিন্তু তাদের হয়ে কাজ করার যাঁরা দাবিদার সেই সমস্ত সংগঠনের পক্ষ থেকে তো কোনো আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি না। ট্রেড ইউনিয়নগুলো চুপচাপ, এনজিওগুলোর তো বলার কথাই নয়।

চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ব্যবস্থাপনাও বিদেশি অপারেটরদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। শুধু তাই নয়, কর্ণফুলী নদীর ধারে একটি বিদেশি কোম্পানিকে অনুমতিও দেওয়া হয়েছে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি টার্মিনাল নির্মাণের। চুপিসারে কাজ এগোচ্ছেও। বন্দর আমাদের, কিন্তু তার ব্যবস্থাপনা বিদেশিদের- স্বাধীন বাংলাদেশে এমন ব্যবস্থার কথাও শেষ পর্যন্ত আমাদের শুনতে হচ্ছে; কেবল শুনতে নয়, দেখতেও হবে, যদি না প্রতিরোধ সফল হয়। প্রতিবাদ বামপন্থি সংগঠনগুলো করছে, কিন্তু প্রকৃত প্রতিরোধের সুযোগটা রয়েছে বন্দরের শ্রমিক ও কর্মচারীদের এবং স্থানীয় মানুষের হাতেই।

তাঁরা তৎপর রয়েছেন জানি, কিন্তু প্রতিরোধের কাজকে আরও শক্তিশালী করাটা যে অত্যাবশ্যক সেটা অস্বীকার করবে কে?

♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us