ঢাকা
২৫ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম
বিটিভিতে আনুপাতিক হারে সরকার-বিরোধীদলের সংবাদ প্রচার হবে: তথ্য প্রতিমন্ত্রী ঢাকার পানি সংকট মোকাবিলায় ডেনমার্কের সহযোগিতা কার্যকর ভূমিকা রাখবে: এলজিআরডি মন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারতের হয়তো রাজনৈতিকভাবে দায় নিতে চাচ্ছে না: তথ্যমন্ত্রী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ: গোলাম পরওয়ার জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে : তথ‍্য উপদেষ্টা বাংলাদেশের সার্বিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে চায় ইউএনডিপি সংসদ অধিবেশন: ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ টানা ভারী বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত দিল্লি, রেড অ্যালার্ট জারি চলতি অর্থবছরেই দেশের সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন: প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী উপলক্ষে র‍্যাবের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা
Advertise with us

দোকানের কেক-বিস্কুট হতে পারে শিশুর খর্বতার কারণ

ডেস্ক রিপোর্ট
শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬   ১১৫ বার পঠিত
দোকানের কেক-বিস্কুট হতে পারে শিশুর খর্বতার কারণ

ছবি: সংগৃহীত

ফাহিমা হোসেন মুনা :বাজার থেকে কিনে আনা রঙিন প্যাকেটের কেক, বিস্কুট, চিপস আর চকলেট বাংলাদেশের অসংখ্য শিশুর নিত্যদিনের খাবারের অংশে পরিণত হচ্ছে।  স্কুলে যাওয়ার পথে, বিকেলের নাশতায় কিংবা কান্না থামানোর সহজ উপায় হিসেবে বাবা-মায়েরা অনেক সময় শিশুর হাতে তুলে দেন প্যাকেটজাত খাবার। ব্যস্ত জীবনে এটি হয়তো সুবিধাজনক একটি সমাধান। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই সহজ অভ্যাসই নীরবে ক্ষতি করছে শিশুদের ভবিষ্যৎ। কেননা, নিয়মিত আল্ট্রা-প্রসেসড বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে, এমনকি তৈরি করতে পারে দীর্ঘমেয়াদি খর্বতা বা স্টান্টিংয়ের ঝুঁকি।

খর্বতা মানে শুধু উচ্চতা কম হওয়া নয়। এটি শিশুর শরীরে দীর্ঘদিনের অপুষ্টির একটি বড় লক্ষণ। যে শিশু বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবে বাড়তে পারে না, তার মস্তিষ্কের বিকাশ, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং শেখার ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এমনকি শৈশবে পুষ্টির ঘাটতি শুধু সেই সময়ের সমস্যা নয়; এর প্রভাব থেকে যেতে পারে পুরো জীবনজুড়ে। ভবিষ্যতে কাজের সক্ষমতা কমে যাওয়া, ঘন ঘন অসুস্থ হওয়া কিংবা মানসিক বিকাশে পিছিয়ে পড়ার মতো সমস্যার সঙ্গেও খর্বতার সম্পর্ক রয়েছে।

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে খর্বতার হার কমেছে ঠিকই, কিন্তু সমস্যা এখনো উদ্বেগজনক। বিভিন্ন জরিপ বলছে, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিশু এখনও খর্বতার শিকার। আগে এই সমস্যার জন্য প্রধানত দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট বা সংক্রমণকে দায়ী করা হতো। কিন্তু এখন, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনও একটি বড় কারণ। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে, শিশুদের খাদ্যতালিকায় দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে প্যাকেটজাত ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার।

বাজারে বিক্রি হওয়া প্যাকেটজাত কেক, বিস্কুট, চিপস এবং কোমল পানীয়  আল্ট্রা-প্রসেসড বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার  হিসেবে চিহ্নিত। এই খাবারগুলোতে প্রচুর পরিমাণে চিনি, লবণ ও ট্রান্স ফ্যাট থাকে, কিন্তু প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক, ক্যালসিয়াম বা ভিটামিনের পরিমাণ অতি নগণ্য। আর এসব খাবার বেশি খাওয়া শিশুদের মধ্যে শারীরিক বিকাশ মন্থর হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

এসব খাবার খেয়ে শিশুর দ্রুত পেট ভরে যায়। ফলে তারা আর ভাত, ডাল, মাছ, ডিম, শাকসবজি বা ফলের মতো পুষ্টিকর খাবার খেতে চায় না। পুষ্টিবিদরা এই ঘটনাকে বলেন নিউট্রিয়েন্ট ডিসপ্লেসমেন্ট বা পুষ্টি প্রতিস্থাপন।

একটি শিশু যদি প্রতিদিন বিস্কুট, চিপস আর কোমল পানীয় খেয়ে পেট ভরায়, তাহলে তার শরীর প্রয়োজনীয় আমিষ, শর্করা, আয়রন, জিঙ্ক, ক্যালসিয়াম কিংবা ভিটামিন থেকে বঞ্চিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই ঘাটতি চলতে থাকলে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়াই স্বাভাবিক।

আরেকটি উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে উচ্চতার উপর সরাসরি প্রভাব নিয়ে। যেসব শিশু দিনে চার থেকে ১২ বার আল্ট্রা-প্রসেসড খাবার খায়, তাদের উচ্চতা-বয়স অনুপাত, যারা একবারও এসব খায় না তাদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এবং সবচেয়ে বেশি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাওয়া শিশুদের মধ্যে স্টান্টিংয়ের সম্ভাবনা তিনগুণেরও বেশি। শুধু ক্যালরি পেলেই শিশু সুস্থভাবে বড় হবে না। তার দরকার সুষম পুষ্টি। অথচ এসব খাবারে ক্যালরি থাকলেও পুষ্টিগুণ অনেক কম।

বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের  বস্তি এলাকাগুলোতে এই সমস্যা আরও স্পষ্ট। ঢাকার বিভিন্ন বস্তি এলাকায় দেখা যায়, সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে অনেক শিশুর নাশতা বলতে একটি ছোট কেক বা পাঁচ টাকার বিস্কুট। অনেক পরিবারে রান্না করার মতো সময় বা সামর্থ্য না থাকায় সহজে পাওয়া যায় এমন খাবারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। আবার অনেক মা–বাবা মনে করেন, শিশু কিছু খাচ্ছে সেটাই যথেষ্ট। খাবারটি পুষ্টিকর কি না, সেটি নিয়ে ভাবার সুযোগ বা সচেতনতা অনেক সময় থাকে না।

দারিদ্র্য অবশ্যই একটি বড় কারণ। কিন্তু শুধু দারিদ্র্য দিয়ে পুরো সমস্যাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ একই দামে একটি কলা, একমুঠো মুড়ি, ভাজা ছোলা বা একটি সেদ্ধ ডিম পাওয়া সম্ভব, যা একটি প্যাকেট বিস্কুটের চেয়ে অনেক বেশি পুষ্টিকর। তবু চকচকে মোড়ক, টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন আর শিশুদের আকর্ষণ করার কৌশলের কারণে প্যাকেটজাত খাবারই বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অনেক শিশুর কাছে চিপস বা চকলেট যেন পুরস্কারের মতো।

এই খাবারগুলোর আরেকটি বড় সমস্যা হলো ট্রান্স ফ্যাট ও অতিরিক্ত চিনি। বাজারে বিক্রি হওয়া অনেক কেক, বিস্কুট ও বেকারি পণ্যে নিম্নমানের তেল ব্যবহার করা হয়। ট্রান্স ফ্যাট শিশুর হৃদ্‌স্বাস্থ্য ও শারীরিক বৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকর।

অন্যদিকে অতিরিক্ত চিনি শিশুর রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ায়, দাঁতের ক্ষতি করে এবং অল্প বয়সেই অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস তৈরি করে। চিকিৎসকদের মতে, ছোটবেলা থেকেই অতিরিক্ত মিষ্টি ও লবণযুক্ত খাবারের অভ্যাস তৈরি হলে পরবর্তী সময়ে স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

অনেক মা-বাবা শিশুর খাবারে অনীহা দেখলে বিকল্প হিসেবে বেছে নেন দোকানের প্যাকেটজাত খাবার। মনে করেন, পেট ভরলেই সন্তান সুস্থ থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। শিশুর খাদ্যাভ্যাস ছোটবেলা থেকেই গড়ে ওঠে, এবং একবার অস্বাস্থ্যকর খাবারে অভ্যস্ত হয়ে পড়লে পরে তাকে পুষ্টিকর খাবারে ফেরানো কঠিন হয়ে যায়। তাই শুধু পেট ভরানো নয়, শিশুকে কী খাওয়ানো হচ্ছে সেটাই আসল প্রশ্ন।

সমস্যার গভীরতা বোঝা গেলে সমাধানও আসলে জটিল নয়।  পরিবারগুলোতে চিনি, পরিশোধিত আটা ও আল্ট্রা-প্রসেসড খাবারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ। পরিবার পর্যায়ে শিশুর হাতে প্যাকেটজাত খাবারের বদলে কলা, সেদ্ধ ডিম, ছোলা, মুড়ি বা দেশীয় ফল তুলে দেওয়া শুরু করতে হবে।

পাশাপাশি সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। স্কুলের আশপাশে অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্যাকেটজাত খাবারের গায়ে সহজ ভাষায় পুষ্টিমান ও ক্ষতিকর উপাদানের তথ্য উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা দরকার। ট্রান্স ফ্যাট ব্যবহারের ওপর আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। শিশুদের লক্ষ্য করে বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন প্রচার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।

গবেষণা অনুযায়ী, সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করা গেলে শিশুর স্টান্টিং ঝুঁকি ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব এটি প্রমাণ করে যে পরিবর্তন সম্ভব, শুধু দরকার সঠিক সিদ্ধান্ত। তাই শিশুর হাতে চকচকে প্যাকেটে মোড়ানো চকলেট তুলে দেওয়ার আগে দুইবার ভাবুন।  কারণ এই ছোট সিদ্ধান্তটা আসলে ছোট নয়। এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে আপনার সন্তানের উচ্চতা, মস্তিষ্কের বিকাশ, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের শক্তি।

লেখক:

রিসার্চ টিম হেড, বিএসইএস। প্রতিষ্ঠাতা ও স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক, এন্টিঅক্সিডেন্ট পাথওয়েজ

amimuna10@gmail.com

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us