মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর শুক্রবার হোয়াইট হাউস এ তথ্য জানিয়েছে।
ওয়াশিংটনে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকে এআই, বাণিজ্য এবং অচলাবস্থায় থাকা ইরান যুদ্ধসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করেন দুই নেতা। বৈঠকে এআই নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি চলতি বছর আরও দু’বার সাক্ষাতের বিষয়েও তারা সম্মত হয়েছেন।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, দুই দেশ এআই-সংক্রান্ত ঘটনাবলি নিয়ে একটি ‘দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ চ্যানেল’ প্রতিষ্ঠা করবে। তবে ওয়াশিংটনের এই ঘোষণার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বেইজিংয়ের কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
আড়ম্বর বেশি, অগ্রগতি কম
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদক অ্যালান ফিশারের মতে, শীর্ষ বৈঠকটি ছিল মূলত আনুষ্ঠানিকতা ও জাঁকজমকে ভরা। বড় ধরনের কোনও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত না হলেও দুই দেশের মধ্যে সংলাপ চালু রাখার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে।
হোয়াইট হাউস থেকে প্রতিবেদন করতে গিয়ে ফিশার বলেন, বৈঠকে ‘অনেক আনুষ্ঠানিকতা ও জাঁকজমক’ ছিল। তার ভাষায়, “অগ্রগতির তুলনায় আড়ম্বরই ছিল বেশি।”
তবে দুই দেশ নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকা বাণিজ্যবিষয়ক সাময়িক সমঝোতার মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই সমঝোতার সময়সীমা জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, যাতে দুই পক্ষের মধ্যে আরও আলোচনা চালানোর সুযোগ তৈরি হয়।
ট্রাম্প বৈঠকের পর বলেন, চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভজনক হবে।
তিনি বলেন, “আমরা দুই অসাধারণ নেতার সঙ্গে দারুণ একটি সফর কাটিয়েছি। আমরা সত্যিই এটি উপভোগ করেছি এবং আমি মনে করি, আমরা অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছি। দুই দেশের জন্যই এটি অত্যন্ত ইতিবাচক।”
এআইয়ে ‘সুস্থ প্রতিযোগিতার’ আহ্বান শি জিনপিংয়ের
এআই নিয়ে দুই দেশের প্রতিযোগিতাকে সংঘাতের দিকে না নিয়ে ‘সুস্থ প্রতিযোগিতায়’ পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা এমন হওয়া উচিত, যেখানে একে অপরকে টপকে যাওয়ার চেষ্টা থাকবে; এমন কোনও লড়াই নয় যেখানে একজন জিতবে আর অন্যজন হেরে যাবে।
শি জিন পিং বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ই এআইয়ের ক্ষেত্রে বিশ্বের ‘শীর্ষস্থানীয় দেশ’। তাই এআইকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের পাশাপাশি এর উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ‘সামর্থ্য ও দায়িত্ব’ও দুই দেশের রয়েছে।
আল-জাজিরার ফিশারের মতে, বৈঠকে শি জিন পিং নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে চীনের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ও আলোচনায় চীনকে যেন ‘আরও ন্যায্যভাবে’ বিবেচনা করা হয়, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা চেয়েছেন তিনি।
একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার জন্য কিছু নীতিগত দিকনির্দেশনাও তুলে ধরেছেন চীনা প্রেসিডেন্ট।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে শি জিনপিং তাইওয়ান ইস্যু ‘বিচক্ষণতার সঙ্গে’ মোকাবিলা করার জন্য ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানান। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন ও কোরীয় উপদ্বীপের পরিস্থিতি নিয়েও দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
বাণিজ্যে নতুন সমঝোতা
বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও কিছু বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ২০২৭ ও ২০২৮ সালে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অন্তত এক কোটি মেট্রিক টন কয়লা আমদানি করবে। পাশাপাশি দুই দেশই প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের ‘অসংবেদনশীল পণ্যের’ ওপর তুলনামূলক সুবিধাজনক শুল্ক আরোপে সম্মত হয়েছে।
বৈঠকের প্রতীকী উপহার ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অংশ হিসেবেও কিছু ঘোষণা এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি চিড়িয়াখানায় চীন থেকে দুটি পান্ডা পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সামরিক কুচকাওয়াজ থেকে সংবিধান
ট্রাম্পের চীন সফরে ছিল রাষ্ট্রীয় ভোজ, সামরিক কুচকাওয়াজ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শন। সেখানে দুই নেতা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও সংবিধানের ঐতিহাসিক দলিল দেখেন।
ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের বয়সের সঙ্গে চীনের দীর্ঘ সভ্যতার ইতিহাসের তুলনা করে বলেন, “আমাদের ২৫০ বছর, আর তাদের ৬ হাজার বছর।”
তিন দিনের সফরজুড়ে দুই দেশের নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। ট্রাম্প বিশেষভাবে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের উন্নতির কথা তুলে ধরেন।
চলতি বছর আরও দু’বার বৈঠক
বৈঠকে দুই নেতা চলতি বছর আরও দু’বার মুখোমুখি হওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন। আগামী নভেম্বরে চীনের শেনঝেনে অনুষ্ঠিতব্য এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন বা এপেক সম্মেলনে তাদের আবার দেখা হবে। এরপর ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে জি২০ সম্মেলনেও বৈঠক করবেন তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বৈঠক থেকে বড় কোনও চুক্তি বা নাটকীয় ঘোষণা না এলেও দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সংলাপ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল।
আল-জাজিরার ফিশারের ভাষায়, “সংলাপের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই সম্ভবত দুই পক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন।”
এআইকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতা ও জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নতুন যোগাযোগ চ্যানেলটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভবিষ্যতে এআই-নির্ভর কোনও প্রযুক্তিগত ঘটনা ভুল বোঝাবুঝি, নিরাপত্তা ঝুঁকি বা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করলে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা