ছবি: সংগৃহীত
দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এইচ-১বি ভিসার ফি ১ লাখ ডলারের বেশি নির্ধারণ করে তা স্থায়ী করার প্রস্তাব দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর আগে আদালত এ ফি অবৈধ ঘোষণা করে আদায় স্থগিত করলেও নতুন প্রস্তাবিত বিধিমালার মাধ্যমে তা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি প্রস্তাবিত বিধিমালাটি ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশ করে। এতে নতুন এইচ-১বি ভিসার জন্য ১ লাখ ৩ হাজার ২৬৫ ডলার ফি স্থায়ী করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বছরের শেষ নাগাদ বিধিমালাটি চূড়ান্ত হতে পারে।
নতুন নিয়ম কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে কাজের জন্য বিদেশি কর্মীদের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে চাকরিতে যোগ দিতে যাওয়া বিদেশি শিক্ষার্থী এবং এইচ-১বি কর্মী নিয়োগ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে বলে জানিয়েছে করপোরেট অভিবাসন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ফ্রাগোমেন।
ভারতীয়দের ওপর বড় প্রভাব
এই পরিবর্তন ভারতীয়দের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এইচ-১বি ভিসার সুবিধাভোগীদের ৭০ শতাংশের বেশি ভারতীয়। যুক্তরাষ্ট্রের সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেসের (ইউএসসিআইএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৪০২টি এইচ-১বি আবেদন অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে ভারতীয় বংশোদ্ভূত সুবিধাভোগী ছিলেন ৭১ শতাংশ।
ট্রাম্প গত বছর প্রথমবারের মতো অস্থায়ীভাবে এই উচ্চ ফি আরোপ করেন। এর ফলে প্রযুক্তি, শিক্ষা ও গবেষণাসহ বিভিন্ন খাতে বহুল ব্যবহৃত এই ভিসার ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।
তবে গত জুনে একজন ফেডারেল বিচারক ফি আরোপকে অবৈধ ঘোষণা করে ট্রাম্প প্রশাসনকে তা আদায় থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আদালতে শুনানি চলছে। অন্য একটি আদালতেও ফি নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জ বিচারাধীন।
ট্রাম্পের আরোপ করা অস্থায়ী ফি বৃদ্ধির মেয়াদ সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। নতুন প্রস্তাব চূড়ান্ত হলে ১ লাখ ৩ হাজার ২৬৫ ডলারের ফি স্থায়ীভাবে কার্যকর হতে পারে।
কারা এই ভিসা পান
এইচ-১বি কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের নিয়োগকর্তারা বিশেষায়িত ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ দিতে পারেন। প্রতিবছর এ কর্মসূচির আওতায় ৬৫ হাজার ভিসা দেওয়া হয়। উচ্চতর ডিগ্রিধারীদের জন্য রয়েছে আরও ২০ হাজার ভিসা।
সাধারণত এসব ভিসার মেয়াদ তিন থেকে ছয় বছর। ট্রাম্পের ফি বৃদ্ধির আগে এই ভিসার জন্য সাধারণত ২ হাজার থেকে ৫ হাজার ডলারের মতো খরচ হতো।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে আগে থেকেই শিক্ষার্থী ভিসায় থাকা বিদেশি নাগরিকদের নতুন এইচ-১বি ভিসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ১ লাখ ৩ হাজার ২৬৫ ডলারের ফি প্রযোজ্য হবে না। একইভাবে বর্তমান ভিসা নবায়নের ক্ষেত্রেও এই ফি কার্যকর হবে না।
ভিসা কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক
এইচ-১বি কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক রয়েছে। ট্রাম্প ও কর্মসূচির সমালোচকদের অভিযোগ, অনেক প্রতিষ্ঠান কম খরচে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করে মার্কিন কর্মীদের চাকরি থেকে সরিয়ে দেয়।
অন্যদিকে ব্যবসায়ী সংগঠন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বলছে, কিছু বিশেষায়িত ক্ষেত্রে যোগ্য মার্কিন কর্মীর ঘাটতি রয়েছে। ফলে প্রযুক্তি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে দক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য এইচ-১বি কর্মসূচি প্রয়োজন।
আদালতে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ প্রায় ৭০টি নিয়োগকর্তা মোট ৮৫টি ভিসা আবেদনের জন্য ১ লাখ ডলারের ফি পরিশোধ করেছিলেন।
ফি আরোপের সময় ট্রাম্প অভিবাসন আইনের অধীনে প্রেসিডেন্টের বিশেষ ক্ষমতার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর বিবেচিত বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ সীমিত করার এই ক্ষমতার আওতায় ফি আরোপ করা যায়।
আদালতে নতুন চ্যালেঞ্জের আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী সংগঠন ইউএস চেম্বার অব কমার্স, ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্য এবং শ্রমিক ও নিয়োগকর্তাদের একটি জোট এই ফি নিয়ে মামলা করেছে। নতুন বিধিমালা চূড়ান্ত হলে এসব মামলায় আবারও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে প্রশাসন।
মামলাকারীদের দাবি, বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ সীমিত করার প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা এইচ-১বি কর্মসূচি তৈরির আইনকে বাতিল বা উপেক্ষা করার সুযোগ দেয় না। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে নতুন ফি বা কর আরোপ করতে পারে না বলেও দাবি তাদের।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, এই ফি প্রচলিত অর্থে কোনো কর নয়। বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ সীমিত করার প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নিয়ে আদালতের হস্তক্ষেপের সুযোগও সীমিত বলে দাবি করেছে প্রশাসন।
কমছে এইচ-১বি আবেদনের সংখ্যা
ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির মধ্যে এইচ-১বি কর্মসূচির আবেদনও কমেছে। গত বছর প্রায় ৩ লাখ ৪৪ হাজার এইচ-১বি ভিসার জন্য নিয়োগকর্তারা নিবন্ধন করেন। ২০২৪ সালের তুলনায় এ সংখ্যা ২৫ শতাংশের বেশি কম এবং ২০২৩ সালের প্রায় ৭ লাখ ৯৪ হাজার নিবন্ধনের অর্ধেকেরও কম।
এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন এইচ-১বি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে আরও কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে নতুন একটি বাছাই প্রক্রিয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে বেশি দক্ষতা ও উচ্চ বেতন পাওয়া কর্মীরা অগ্রাধিকার পেতে পারেন।
চলতি আগস্টের শুরুতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ পৃথক একটি বিধিমালায় এইচ-১বি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন এবং বিদেশে থাকা কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ফি যুক্ত করেছে।