ঢাকা
০৩ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম
দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘স্কুল মিল’ চালু করা হবে: প্রতিমন্ত্রী হাজ্জাজ ছাত্রশিবির প্রতিটি ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের হেনস্থা করছে: নাছির উদ্দীন জামায়াতের পরামর্শে রাজনৈতিক পরিবেশ নষ্ট করছে এনসিপি: রাশেদ খান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নই সরকারের প্রধান লক্ষ্য : মাহদী আমিন আন্দোলন-সংগ্রামে আহত ও নিহতদের পাশে দাঁড়াবে সরকার: প্রেস সচিব পুলিশের জারি করা সর্বোচ্চ সতর্কতা শুধু একটি ‘রিমাইন্ডার’: ডিবি প্রধান বাংলাদেশ-নেপালের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও দীর্ঘ হবে: মির্জা ফখরুল জ্বালানি সংকট ও ব্যাংকে টাকা নেই, দেশে চলছে দলীয় সন্ত্রাস : নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী ফ্যাসিস্টদের ফটোকপি বিএনপির মধ্যে দেখতে পাচ্ছি : জামায়াত আমির দুবাই কারাগার থেকে ছাড়া পেলেন বেনজীর
Advertise with us

ভবিষ্যত যুদ্ধের প্রথম নিশানা হতে পারে মহাকাশের স্যাটেলাইট?

ডেস্ক রিপোর্ট
রবিবার, ০২ আগস্ট ২০২৬   ২০ বার পঠিত
ভবিষ্যত যুদ্ধের প্রথম নিশানা হতে পারে মহাকাশের স্যাটেলাইট?

ছবি: সংগৃহীত

এক সময় মহাকাশকে যুদ্ধের বাইরে একটি নিরাপদ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর ২১শ’ শতাব্দীর যুদ্ধের বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধে প্রথম গুলি ছোড়া নাও হতে পারে বন্দুক বা ক্ষেপণাস্ত্র থেকে; বরং পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটে সাইবার হামলা, ইলেকট্রনিক জ্যামিং বা অন্য কোনও মহাকাশভিত্তিক আক্রমণের মাধ্যমেই সংঘাতের সূচনা হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক সামরিক অভিযান, যোগাযোগ ব্যবস্থা, জিপিএস নেভিগেশন, গোয়েন্দা নজরদারি, ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনা থেকে শুরু করে ব্যাংকিং ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মতো অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এখন স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল। ফলে স্যাটেলাইট অকার্যকর করতে পারলে একটি দেশের সামরিক ও বেসামরিক সক্ষমতা একসঙ্গে বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে।

ইউক্রেন যুদ্ধে প্রথম আঘাত এসেছিল স্যাটেলাইটে
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোররাতে ইউক্রেন ও মধ্য ইউরোপজুড়ে হাজার হাজার স্যাটেলাইট মডেম হঠাৎ অকার্যকর হয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টা পরই ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) অ্যারোস্পেস সিকিউরিটি প্রজেক্টের পরিচালক কারি বিঙ্গেন বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রথম আঘাত ছিল না সীমান্ত অতিক্রম করা ট্যাংক; বরং একটি বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কে চালানো সাইবার হামলা। এর উদ্দেশ্য ছিল ইউক্রেনের সরকার ও সেনাবাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল করে দেওয়া।

তার ভাষায়, আধুনিক যুদ্ধে প্রথম অস্ত্র হতে পারে একটি ক্ষতিকর কম্পিউটার কোড, যা পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটকে লক্ষ্য করে পাঠানো হয়।

মহাকাশে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা
শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্থল, আকাশ ও সমুদ্রের পাশাপাশি মহাকাশেও বিস্তৃত ছিল। তবে সেই প্রতিযোগিতা অনেকটাই আড়ালে ছিল। বর্তমানে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবারও প্রকাশ্যে ফিরে এসেছে।

বিশ্বব্যাপী প্রায় ৬২৬ বিলিয়ন ডলারের মহাকাশ অর্থনীতি এখন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার দুটি স্যাটেলাইট—লুচ-১ ও লুচ-২—কমপক্ষে এক ডজন ইউরোপীয় স্যাটেলাইটের যোগাযোগে আড়িপাতার চেষ্টা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি প্রয়োজনে স্যাটেলাইটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

সন্দেহজনক কক্ষপথ পরিবর্তন
গত কয়েক বছরে ভূমিভিত্তিক টেলিস্কোপ ও মহাকাশ ক্যামেরায় দেখা গেছে, রাশিয়ার লুচ-১ ও লুচ-২ স্যাটেলাইট একাধিকবার ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ ভূস্থির যোগাযোগ স্যাটেলাইটের খুব কাছাকাছি চলে গেছে।

এসব স্যাটেলাইট পৃথিবীর অনেক ওপরে একই অবস্থানে থেকে যোগাযোগ, নেভিগেশন ও সামরিক তথ্য আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এগুলো সম্ভাব্য সংঘাতে অত্যন্ত মূল্যবান লক্ষ্যবস্তু।

ফরাসি স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান অ্যালডোরিয়ার জ্যেষ্ঠ কক্ষপথ বিশ্লেষক নরবার্ট পুজাঁ বলেন, যখন একটি স্যাটেলাইট আরেকটির খুব কাছে চলে আসে, তখন এটি অনেকটা দাবা খেলার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। কে আগে কক্ষপথ পরিবর্তন করবে এবং অন্যটি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে- সেটিই তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে আকাশযুদ্ধের ‘ডগফাইট’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন, পার্থক্য শুধু এটি মহাকাশে ঘটছে।

হাইব্রিড যুদ্ধের নতুন মাত্রা
যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের মহাকাশ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জুলিয়ানা সুয়েসের মতে, রাশিয়ার এই তৎপরতা তাদের দীর্ঘদিনের ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ কৌশলেরই অংশ।

তিনি বলেন, রাশিয়া গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন দেশের সীমা পরীক্ষা করে আসছে। কখনও ড্রোন দিয়ে অন্য দেশের আকাশসীমায় প্রবেশ করছে, কখনও পশ্চিমা বা বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের খুব কাছে নিজেদের স্যাটেলাইট নিয়ে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা দেখাতে চাইছে যেকোনও ক্ষেত্রই নিরাপদ নয়—মহাকাশও নয়।

স্যাটেলাইট ধ্বংসে নানা ধরনের অস্ত্র
বর্তমানে স্যাটেলাইট ধ্বংস বা অকার্যকর করার জন্য বিভিন্ন ধরনের ‘কাউন্টারস্পেস’ অস্ত্র তৈরি হয়েছে।

এসবের মধ্যে রয়েছে- সাইবার হামলা, স্যাটেলাইটের যোগাযোগে জ্যামিং ও স্পুফিং, লেজার অস্ত্র, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পালস, ভূমি, আকাশ বা মহাকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, অন্য স্যাটেলাইট থেকে ছোড়া গতিশক্তিনির্ভর (কাইনেটিক) অস্ত্র।

কারি বিঙ্গেন বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধে স্যাটেলাইটে সাইবার হামলা ও ইলেকট্রনিক জ্যামিং এখন নিয়মিত ঘটনা। একই ধরনের সক্ষমতা চীনও দ্রুত বাড়াচ্ছে। এমনকি কম ক্ষমতার জিপিএস জ্যামার এখন অনলাইনেও কেনা সম্ভব।

ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে স্যাটেলাইট ধ্বংসের প্রতিযোগিতা
২০০৭ সালে চীন একটি পরিত্যক্ত আবহাওয়া স্যাটেলাইট ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করে। এতে হাজার হাজার মহাকাশ ধ্বংসাবশেষ সৃষ্টি হয়, যেগুলোর অনেকগুলো কয়েক দশক কক্ষপথে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রও একটি বিকল স্যাটেলাইট ধ্বংস করে। পরে ভারত একই ধরনের সক্ষমতার প্রদর্শন করে।

২০২১ সালের নভেম্বরে ইউক্রেন আক্রমণের কয়েক মাস আগে রাশিয়াও একটি স্যাটেলাইট ধ্বংসের পরীক্ষা চালায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পরীক্ষা শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রদর্শন নয়; বরং প্রতিপক্ষকে কৌশলগত বার্তা দেওয়ারও অংশ।

মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্রের আশঙ্কা
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে রাশিয়া কসমস-২৫৫৩ নামে একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে। পরে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, এটি মহাকাশভিত্তিক পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির অংশ হতে পারে। যদিও রাশিয়া এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, এ ধরনের অস্ত্র বিস্ফোরিত হলে শক্তিশালী ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পালস তৈরি হয়ে একসঙ্গে অসংখ্য স্যাটেলাইট অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। এর ফলে স্পেসএক্সের স্টারলিংকের মতো বিশাল স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কও ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞ জুলিয়ানা সুয়েস মনে করেন, রাশিয়া এমন অস্ত্র তৈরি করতে পারলেও তা ব্যবহার করার সম্ভাবনা খুব কম। কারণ এতে চীনসহ অন্যান্য মিত্র দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যারা নিজেরাও এখন মহাকাশ প্রযুক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

‘কেসলার সিনড্রোম’-এর ভয়
স্যাটেলাইট ধ্বংসের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির একটি হলো ‘কেসলার সিনড্রোম’।

এক্ষেত্রে একটি স্যাটেলাইট ধ্বংস হলে তার ধ্বংসাবশেষ অন্য স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটিয়ে আরও বেশি ধ্বংসাবশেষ তৈরি করে। এভাবে একসময় পুরো কক্ষপথ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে এবং বহু বছর মহাকাশে নতুন অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

ভবিষ্যতের যুদ্ধ কেমন হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে শুধু ধ্বংস নয়, স্যাটেলাইট রক্ষার প্রযুক্তিও দ্রুত উন্নত হবে।

জাপান, ফ্রান্স, ভারত ও জার্মানি ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্যাটেলাইট পাহারা দেওয়ার জন্য ‘গার্ডিয়ান’ বা ‘বডিগার্ড’ স্যাটেলাইট তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে। এসব স্যাটেলাইট প্রয়োজনে মূল্যবান স্যাটেলাইটকে সুরক্ষা দেবে অথবা সন্দেহজনক অন্য স্যাটেলাইটের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করবে।

অন্যদিকে চীনের গবেষণায় দেখা গেছে, ড্রোন, বেলুন বা উড়োজাহাজে বহনযোগ্য শত শত সমন্বিত জ্যামার ব্যবহার করে স্টারলিংকের মতো স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের যোগাযোগ একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে অকার্যকর করে দেওয়াও সম্ভব হতে পারে।

ভুল হিসাবেই শুরু হতে পারে বড় সংঘাত
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মহাকাশে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যত বাড়বে, ভুল বোঝাবুঝি বা ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকিও তত বাড়বে।

জুলিয়ানা সুয়েসের ভাষায়, যদি কোনও স্যাটেলাইট হঠাৎ ভেঙে যায় এবং কাছাকাছি আরেকটি সন্দেহজনক স্যাটেলাইট অবস্থান করে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে- এটি কি ইচ্ছাকৃত হামলা, নাকি কেবল দুর্ঘটনা? আর সেই অনিশ্চয়তাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে। সূত্র: বিবিসি

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us