ঢাকা
১৬ অক্টোবর ২০২৬
Advertise with us

গুলশান-বনানী পূজামণ্ডপের এবারের থিম ‘জলজ’

ডেস্ক রিপোর্ট
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬   ১৮ বার পঠিত
গুলশান-বনানী পূজামণ্ডপের এবারের থিম ‘জলজ’

ছবি: সংগৃহীত

অনন্ত মহাবিশ্বের শতকোটি গ্রহ-নক্ষত্রের মাঝে পৃথিবীই একমাত্র প্রাণোচ্ছল নীলাভ নীড়, আর এই প্রাণের অস্তিত্বের প্রথম ও প্রধান পূর্বশর্ত হলো জল।

আধুনিক বিজ্ঞান যেমন পৃথিবীতে জীবনের সূচনাকে জলের সঙ্গে যুক্ত করেছে, তেমনি হাজার হাজার বছর আগে বৈদিক ঋষিরাও জলকেই সৃষ্টির আদি তত্ত্ব হিসেবে উপলব্ধি করেছিলেন।

ঋগ্বেদের নাসদীয় সূক্তে সৃষ্টির পূর্বাবস্থার বর্ণনায় বলা হয়েছে-সৃষ্টির আদিতে সর্বত্র ছিল অন্ধকারে আচ্ছন্ন এক অসীম জলরাশি। সনাতন ভাবনায় পঞ্চমহাভূতের মধ্যে ‘অপ’ বা জলই সেই মূল উপাদান, যা বাকি সব উপাদানের মাঝে প্রাণসঞ্চার করে। নদী, বৃষ্টি, পুকুর, বিল ও সমুদ্রের সঙ্গে গড়ে ওঠা আমাদের রূপসী বাংলার জীবন ও সংস্কৃতির গভীরে জলের এই অস্তিত্বকেই এবার দুর্গাপূজার ভাবনায় ধারণ করে গুলশান–বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন বেছে নিয়েছে অনন্য এক থিম -‘জলজ’ (জল থেকে যার জন্ম)।

সনাতন ধর্মে জল কেবল একটি প্রাকৃতিক উপাদান নয়; জল স্বয়ং পবিত্রতা, পরমেশ্বর ও পরম সংস্কারের স্তম্ভ। মাতৃগর্ভের তরল থেকে শুরু করে গঙ্গাতীরে জীবনের শেষ অঞ্জলি – মানুষের সমগ্র জীবনচক্র জলের প্রবাহেই বাঁধা। জলই মাঙ্গলিক সূচনা, ঘটস্থাপন, তর্পণ, হোম কিংবা আত্মশুদ্ধির প্রধান মাধ্যম। শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দেবী মা কেবল শক্তিরূপা নন, তিনি জীবের জীবনধারণের মূল আকুতি:‘তৃষ্ণারূপেণ সংস্থিতা!’ জলের বুক চিরে যেমন পদ্ম প্রস্ফুটিত হয়, তেমনি জীবচেতনার তৃষ্ণা থেকেই প্রকাশিত হন মহাশক্তি মা দুর্গা।

এই ভাবনাকেই এবছর গুলশান–বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের মণ্ডপসজ্জায় স্থাপত্য, প্রকৌশল, কুটিরশিল্প, আলোক-নকশা আর নানান অলংকরণের মিশেলে রূপ দেয়া হচ্ছে এক বৃহৎ জলজ জৈব-রূপকল্পে। পরিবেশবান্ধব উপাদান যেমন বাঁশ, বেত, প্রাকৃতিক তন্তু ও চটের সাহায্যে নির্মিত হবে ঢেউখেলানো বহুস্তরীয় দৃশ্যপট, যা এক স্থির বিশাল উর্মিমালার মতো দর্শককে ঘিরে রাখবে। প্রবেশপথ থেকে মণ্ডপের অন্তঃস্থল পর্যন্ত দর্শকের যাত্রা হবে এক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা – প্রকৃতির উত্তাল তরঙ্গ থেকে শান্ত হয়ে মাতৃচরণের দিকে অগ্রসর হওয়া। জলপ্রপাত, রিফ্লেকশন পুল ও আলোর মেলবন্ধনে সৃষ্টি হবে এক রূপান্তরশীল পরিবেশ। আর প্যান্ডেলের কেন্দ্রে থাকবে একটি বৃহৎ পদ্মরূপী স্থাপত্য, যেখান থেকে জলের গভীরতা থেকে প্রস্ফুটিত পদ্মের মতো শংখ-পটে উদ্ভাসিত হবেন আদ্যাশক্তি মা দুর্গা।

তবে ‘জলজ’ কেবল ধর্মীয় অনুভূতির মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি তার আবেদনকে প্রসারিত করেছে বৈশ্বিক ও পরিবেশগত সামাজিক দায়বদ্ধতায়। আজ জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দখল ও জলদূষণের কারণে পৃথিবীর জলচক্র মারাত্মক সংকটে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্য এই সংকট অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাই জলকে সম্মান করা ও রক্ষা করা মানেই জীবন, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা। ‘জলজ’ মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার, প্রকৃতিকে ভালোবাসার এবং জীবমণ্ডলকে রক্ষা করার এক সানন্দ আহ্বান।

জল, পদ্ম, তীর্থবারি, তৃষ্ণা ও পরম জীবন – এ সবকিছু মিলিয়ে দেবী দুর্গার কাছে আমাদের আকুল প্রার্থনা: মা, তুমি বিশ্বসংসারকে তৃষ্ণামুক্ত করো, জীবন ও প্রকৃতিকে রক্ষা করো, মানুষকে দাও সংহার নয়, সৃষ্টির শক্তি।

গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এবং স্থপতি অমিতি কুন্ডু ও শিল্পী-গবেষক পার্থপ্রতিম সাহার পরিকল্পনা, ডিজাইন ও তত্ত্বাবধানে বনানী কামাল আতাতুর্ক পার্কে শারদোৎসবের এই অভিনব ও দৃষ্টিনন্দন সার্বজনীন মন্ডপ সকল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের জন্য উন্মুক্ত।

Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us