ঢাকা
২৪ জুন ২০২৬
শিরোনাম
বাইরের শত্রুর চেয়ে ঘরের শত্রুই বেশি ভয়ংকর: মিয়া গোলাম পরওয়ার আ.লীগ ও বিএনপির বিরুদ্ধে সমানভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে: ১১ দলের সমাবেশে নাহিদ বিচার নিশ্চিত করুন, না হয় যাওয়ার পথ খুঁজুন: সরকারকে জামায়াত আমির সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের দুঃখ প্রকাশ তাজিয়া মিছিলে ধারালো অস্ত্র-আতশবাজি নিষিদ্ধ: ডিএমপি ১৫ বছরের মধ্যে মিসরের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে ইসরায়েল: ইহুদি নেতার সতর্কবার্তা কোনো রোগী যেন চিকিৎসার অভাবে দুর্ভোগে না পড়ে : সমাজকল্যাণ মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে যোগ দিতে রাতে বেইজিং যাচ্ছেন তথ্যমন্ত্রী ‘আমার বন্ধু মহা জাদু জানে’ গান দিয়ে তারেক রহমানের সফরের ভিডিও প্রকাশ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল ইনার হুইল প্রেসিডেন্টের সৌজন্য সাক্ষাৎ
Advertise with us

গণতন্ত্র ও দারিদ্র্য

ডেস্ক রিপোর্ট
মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬   ৮ বার পঠিত
গণতন্ত্র ও দারিদ্র্য

ছবি: সংগৃহীত

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : এটা খুবই সহজ কথা যে গণতন্ত্র ও দারিদ্র্য একসঙ্গে চলতে পারে না। সবাই বলে এ কথা। সরকারের মন্ত্রীরাও বলেন। আসলে দারিদ্র্য হচ্ছে এক ধরনের ব্যাধি। খুবই বাজে রোগ সে। মানুষকে হেয়, বিব্রত, বিপন্ন করে। ছোট করে ফেলে। খুবই আত্মসচেতন করে রাখে। বিপদে ফেলে দেয় যখনতখন যেখানেসেখানে। না, দারিদ্র্যের মধ্যে মাহাত্ম্য বলে কিছু নেই। অসামান্যদের কথা আলাদা, দারিদ্র্যের আগুনে পুড়ে পুড়ে তাঁরা অনেকেই খাঁটি সোনা হয়ে উঠেছেন এ আমরা জানি। জীবনীতে পড়েছি। তা ভিতরে সোনা ছিল বলেই ‘খাঁটি’ হয়েছেন, নইলে পুড়ে কয়লা হতেন, কিংবা ছাই : ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যা সত্য। কাজী নজরুল ইসলামের সেই ‘দারিদ্র্য’ কবিতাটি আমি যতবার পড়েছি, কিংবা তাঁর সম্পর্কে যতবার ভেবেছি, ততবারই মনে হয়েছে কবি ব্যতিক্রমীদের একজন। নইলে দারিদ্র্য মহৎ করেছে মানুষকে, এমন তো দেখিনি। পঙ্গু করেছে, পাত্র করেছে ভিক্ষার কিংবা তার চেয়েও যা খারাপ। ক্ষেত্র করেছে অবজ্ঞার-এই তো দেখে এলাম সারা জীবন। আমার বাপ-দাদাও তাই দেখে এসেছেন, এই গরিব দেশে।

আমাদের যত যত সমস্যা ও ব্যর্থতা, তার পেছনে যে দারিদ্র্য রয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে কি? যেমন পরিবার পরিকল্পনা। ছোট পরিবার সুখী পরিবার-এটা সত্য; কিন্তু তারও চেয়ে বড় সত্য হচ্ছে ধনী পরিবার মানেই ছোট পরিবার। পরিবার ছোট হলেই যে সুখী হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অসুখবিসুখ, ঝগড়াকলহ, মনোমালিন্য, অধিক আদরে ছেলেমেয়ে নষ্ট-ইত্যাদি সমস্যা থাকতেই পারে। থাকেই। অনেকে তো বিয়েই করতে পারেনি। নিজেই নিজের পরিবার এবং পরিবার পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে আদর্শ বটে, কিন্তু তেমন পুরুষ কিংবা মহিলা, বিশেষ করে মহিলা, নিজেকে আদর্শ মানুষ কিংবা স্বর্গসুখ ভোগকারী ব্যক্তিত্ব বলে মনে করেন, এমনটা মনে হয় না। আলাপ করে দেখুন, বিষণ্ন হয়ে ফিরে আসবেন। এদের অনেকেই দুঃখের প্রতিমূর্তি।

ব্যতিক্রম সর্বক্ষেত্রেই সম্ভব, কিন্তু সাধারণভাবে বলতে গেলে বলা যাবে ধনী পরিবারেই পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি সফল হয়েছে। দরিদ্রদের মধ্যে তা ব্যর্থ। যেজন্য জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা যাচ্ছে না। শত চেষ্টা করেও কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারছে না। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও এখন আগের তুলনায় সচেতন, তাদের ক্ষেত্রেও পরিবার এখন ছোট হয়ে আসছে। তবে মধ্যবিত্তও ধনীই বটে, বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষের তুলনায় ধনী।

দরিদ্র মানুষ আগামী বছরের কথা দূরে থাক, আগামীকালের কথাই ভাবতে পারে না। তারা সকালে ভাবে দুপুরে কী খাবে, দুপুরে ভাবে রাতের কথা, এর বেশি ভাববার ক্ষমতাই রাখে না। মনে করে ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই। এই হতাশা সবকিছু অপহরণ করে নেয়। গরিব মানুষ উচ্চতর জীবনের স্বপ্ন রাতেও দেখে না, দিনে তো নয়ই। ভাবে, এরকমই ছিল আমার বাবার, বাবার বাবা, এরকমই থাকব আমি, থাকবে আমার সন্তানসন্ততি। ভবিষ্যতহীন, চেতনাহীন, দায়িত্বজ্ঞানহীন এই মানুষদের কাছ থেকে অনেক কিছুই আশা করা যায় না, পরিবার পরিকল্পনাও নয়। এটা পরিবার পরিকল্পনার কর্মীরাও বোঝেন, কিন্তু অধিকাংশ সময়েই বলেন না। জানেন বলে লাভ হবে না, ক্ষতি হবারই আশঙ্কা।

এখন দেশে শিক্ষার ব্যাপারে আগের আগ্রহ নেই। বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ের শিক্ষায়। এর কারণটাও ওই দারিদ্র্যই। মানুষ দেখতে পাচ্ছে লেখাপড়া শিখে লাভ হচ্ছে না। চাকরি হচ্ছে না। উপার্জনের আশা নেই। এই পরিস্থিতিতে ছাত্রসমাজের মধ্যে খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক হতাশা দেখা দিয়েছে। শিক্ষার ব্যাপারে অনীহা এবং ঠিক বিপরীতে সন্ত্রাসের ব্যাপারে আগ্রহ ওই হতাশারই দুটি ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ বটে।

মৌলবাদও দারিদ্র্যের সঙ্গে যুক্ত। দরিদ্র মানুষ ভরসা করবার মতো কিছু পাচ্ছে না, আশ্রয় নেই, বিচার নেই, ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নেই, এরকম মানসিক অবস্থায় ইহজাগতিকতার চর্চা অসম্ভব। আমরা বিদ্যাসাগরের কথা জানি। বিদ্যাসাগরের পক্ষে ইহজাগতিকতার চর্চা অসম্ভব হতো, যদি গ্রামের দরিদ্র ব্রাহ্মণ থাকতেন, যদি তাঁকে পরনির্ভর হয়ে থাকতে হতো। সেটা ছিলেন না বলেই ইহজাগতিক হয়েছেন, অন্যরা হননি, তারা মন্ত্র পড়েছেন এবং দক্ষিণা কী পাওয়া যাবে বা যাবে না তার হিসাব করেছেন।

আমরা যে ব্যাপক হারে ইহকালের ভূমি ছেড়ে জীবিত অবস্থাতেই পরকালের দিকে প্রবল বেগে ধাবিত হতে পছন্দ করি, তার কারণ আর কিছুই নয়, ইহকালের দুরবস্থা ছাড়া। কেবলি উচ্ছেদ হচ্ছি, উদ্বাস্তু হয়ে পরকালে জায়গাজমির দরদাম করছি। এই যে অন্তঃসারশূন্য আধ্যাত্মিকতা, এই যে ফকিরি, উদাসীনভাব, এ বড়ই বাস্তবিক সত্য; এবং তা বাস্তবিক কারণ থেকেই উদ্ভূত। এর পেছনে কোনো অলৌকিক অনুপ্রেরণা নেই।

আর দারিদ্র্য তো আজকের নয়, যুগযুগান্তের। সেই অন্তহীন দারিদ্র্য ব্যক্তির জীবনে এমন হীনম্মন্যতা তৈরি করে রেখেছে যে অবস্থা ভালো হলেও গরিবই থেকে যাই-মনের দিক থেকে। ঈর্ষা, অবিশ্বাস, ক্ষুদ্র স্বার্থের পাহারাদারি, কলহ, কোন্দল কেবল যে কাজ হয়ে দাঁড়ায় তা নয়, প্রধান বিনোদনেও পর্যবসিত হয়। অন্য কোনো আনন্দে অভ্যাস নেই, ঝগড়াফ্যাসাদ ভিন্ন। আজকাল আমরা দারিদ্র্যও বিক্রি করছি দেশবিদেশে। কিন্তু দরিদ্র মানসিকতা বিক্রি করতে পারব না।

কেউ কিনবে না। বৈষয়িকভাবে মোটেই অভাবে নেই, কিন্তু দেখলেই মনে হবে অত্যন্ত অভাবগ্রস্ত। সাহায্য চাইছেন না, কিন্তু তবু মনে হবে চাইছেন। এরকম অবস্থাপন্ন কিন্তু তবু দুস্থ মানুষ কি আপনি দেখেননি, দেখেছি। আপনিও দেখেছেন, আমার দৃঢ়বিশ্বাস। দারিদ্র্য যখন কারও সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাকে কাটিয়ে ওঠা দুঃসাধ্য। টাকাপয়সায় কাটে না। এক প্রজন্মে কাটতে চায় না। আর আগের প্রজন্মে আমরা কে-ই বা কী ছিলাম, বাপ-দাদা কীই-বা রেখে গেছেন, অভাব ছাড়া? শুধু ব্যাধি কেন বলব, দারিদ্র্য অত্যন্ত কঠিন ও জটিল ব্যাধি।

তাই বলে কি আমরা ভোগবিলাসের পক্ষে? না, অতিরিক্ত ভোগবিলাস কিংবা অপচয় কোনোটারই পক্ষে নই আমরা। আমরা চাই সুস্থ ও সমৃদ্ধ জীবন, তাতে আনন্দ থাকবে, অবকাশ থাকবে, থাকবে সৃষ্টিশীলতা। ভোগবিলাসে সৃষ্টি নেই, দেওয়া নেই, কেবল নেওয়াই আছে। দারিদ্র্যের সংজ্ঞা যে আপেক্ষিক তা-ও জানি। তবু দারিদ্র্য যে কী বস্তু, তা বাংলাদেশের মানুষ আমরা যদি না বুঝি, তবে কে বুঝবে।

এর সঙ্গে গণতন্ত্রের শত্রুতা একেবারেই স্বভাবগত। গণতন্ত্র ও দারিদ্র্য একে অন্য থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র স্বভাবের। গণতন্ত্রের একটি মূল বিষয় হচ্ছে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া; কিন্তু দরিদ্র মানুষ কী ভাগ করবে, অভাব ছাড়া। অভাব তো অবিভাজ্য, যারটা তারই থাকে, ভাগ করতে গেলে নেওয়ার লোক পাওয়া যায় না খুঁজে। নাম শুনলেই দৌড়ে পালায়। গণতন্ত্র প্রকাশ্য, আবার গোপনীয়। গণতন্ত্র সবল, দারিদ্র্য দুর্বল। গণতন্ত্র মানুষকে মেলায়, দারিদ্র্য বিচ্ছিন্ন করে।

গণতন্ত্র জগৎমুখী, দারিদ্র্য আত্মত্বমুখী। গণতন্ত্র আলাপ করে দারিদ্র্য করে কলহ। না, গণতন্ত্র ও দারিদ্র্য কিছুতেই একসঙ্গে থাকতে পারে না। তার চেয়েও বড় কথা, দারিদ্র্য থাকলে গণতন্ত্র থাকে না, থাকতে পারে না। কেবল যে ভোট কেনাবেচা কিংবা ছিনতাই হয় তা-ই নয়, মানুষ মানুষে মিলনটাই গড়ে ওঠে না। উন্মুক্ত প্রান্তরে আসে না, অন্যের সঙ্গে সমঝোতা, সহযোগিতা কিছুই করে না। মন্ত্রীরা যখন বলেন দারিদ্র্যই গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু, তখন খুবই যথার্থ কথা বলেন বটে। প্রকৃত গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু হচ্ছে দারিদ্র্য।

কিন্তু দারিদ্র্যের কারণ কী তা তো কেউ বলেন না। না, সেটা বলেন না। বলেন যখনতখন আসল কথা না বলে আজেবাজে কথা বলেন। মুখ্যকে গৌণ করে, গৌণকেই ধরে টানাটানি করেন। বলেন, দারিদ্র্যের কারণ আমাদের আলস্য। আমরা কাজ করি না। ফাঁকি দিই। বলেন, দারিদ্র্যের কারণ আমাদের জনসংখ্যা। এত মানুষ, এদের কে খাওয়াবে, যা আছে খাওয়াতেই শেষ, উন্নতি কী করে হবে? কী করে ঘুচবে দারিদ্র্য? কেউ বলেন, অন্য কিছু নয়, দায়ী আমাদের দুর্নীতি। চোর। চোরে ছেয়ে গেছে দেশ। চাটার দল। বেত চাই। বেতাতে হবে। এসব বলেন, কিন্তু দারিদ্র্যের আসল কারণটা দেখেন না, বা দেখলেও মানতে চান না।

অন্য কারণ অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু আসল কারণ হচ্ছে বৈষম্য। এই বৈষম্যই দারিদ্র্য সৃষ্টি করছে এবং করেছে। না, দারিদ্র্য বৈষম্য সৃষ্টি করেনি।  উল্টোটাই সত্য। বলা হবে, এবং হচ্ছে যে প্রতিযোগিতা থাকা ভালো। হ্যাঁ, তা ভালো বৈকি।

প্রতিযোগিতা ছাড়া উন্নতি নেই। কিন্তু কার সঙ্গে কার প্রতিযোগিতা, সেটা তো দেখতে হবে। হাত-পা বেঁধে পানিতে ফেলে দিয়ে যদি বলি তুমি আমার সঙ্গে সাঁতরাও দেখি, পাল্লা দাও, তাহলে লোকটি তো পারবে না, ডুবেই মরবে। সাঁতরাতে বলার আগে তার হাত-পায়ের বন্ধনগুলো কাটতে হবে, তাকে মুক্ত করতে হবে, তবেই সাঁতারের প্রশ্নটা উঠবে। নইলে তা নিষ্ঠুর বিদ্রুপ ছাড়া আর কী। দেশের অধিকাংশ মানুষই এই হাত-পা বাঁধা অবস্থায় রয়েছে, তারা নিক্ষিপ্ত হয়েছে দারিদ্র্যের জলাশয়ে। তাদের অবস্থা সাঁতরে তীরে ওঠার নয়, অবস্থা ডুবে মরবার।

♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us
Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930