ঢাকা
০৬ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম
প্রধানমন্ত্রী ১০০ টাকায় লাঞ্চ করেন, আমরাও করি: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী জুলাই সনদকে অস্বীকার করে বিএনপি জাতির সঙ্গে গাদ্দারি করছে: নাহিদ ইসলাম খেলা শেষ, খোদা হাফেজ: মাহফুজ আলম ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়ে তামাশা করার জন্য কাউকে সংসদে পাঠায়নি: চরমোনাই পীর দেশের স্বার্থে সবাইকে আরও দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে হবে: প্রধানমন্ত্রী প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীর সঙ্গে আইওএম বাংলাদেশের চিফ অব মিশনের সৌজন্য সাক্ষাৎ ‘বিশ্বমানের প্রাথমিক শিক্ষা গড়তে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার’ এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অর্থনীতিবান্ধব রাজনীতি প্রয়োজন : তথ্যমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি চীনকেও কাছে টানছে বাংলাদেশ পতিত সরকার কোনো প্রকল্পই জনস্বার্থে নেয়নি: বিদ্যুৎমন্ত্রী
Advertise with us

ধ্বংসস্তূপের নিচে ৩২ ঘণ্টার বিভীষিকা, যেভাবে বেঁচে ফিরল ১২ বছরের কিশোরী

ডেস্ক রিপোর্ট
সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬   ২১ বার পঠিত
ধ্বংসস্তূপের নিচে ৩২ ঘণ্টার বিভীষিকা, যেভাবে বেঁচে ফিরল ১২ বছরের কিশোরী

ছবি: সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলায় গত ২৪ জুনের বিধ্বংসী ভূমিকম্পে মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়েছিল ১০ তলা আবাসিক ভবন। ধ্বংসস্তূপের নিচে টানা ৩২ ঘণ্টা আটকে থেকেও অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যায় ১২ বছর বয়সী ফাবিয়ানা ব্লাঙ্কো। উদ্ধার হওয়ার পর সে জানায়, ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে থাকা একটি কেচাপের বোতল ও কিছু কুচানো চিজ খেয়েই সে বেঁচে ছিল।

ফাবিয়ানার মা কারিনা ব্লাঙ্কো তখন স্পিনিং ক্লাস নিতে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় মাটি কাঁপতে শুরু করে। প্রথমে হালকা কম্পন হলেও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তা ভয়াবহ রূপ নেয়।

কারিনা বলেন, “ভূমিকম্পের তীব্রতা বুঝতে পেরেই আমি শুধু চিৎকার করছিলাম- ‘আমার মেয়ে, আমার মেয়ে।’ তারপর গাড়িতে উঠে যত দ্রুত সম্ভব বাড়ির দিকে ছুটে যাই।”

সেদিন বাড়িতে একাই ছিল ফাবিয়ানা। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের দ্বিতীয়টির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫, যা এক শতাব্দীর মধ্যে ভেনেজুয়েলার অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মুহূর্তেই ধসে পড়ে ১০ তলা ভবন
উত্তরাঞ্চলীয় লা গুইরা অঙ্গরাজ্যের কারাবালেদায় নিজ বাড়িতে পৌঁছে কারিনা স্তম্ভিত হয়ে যান।

তিনি বলেন, “একটি ভবন দেখলাম, তারপর যেখানে আমাদের ভবন ছিল সেখানে শুধু ফাঁকা জায়গা, এরপর আরেকটি ভবন। বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে, পুরো ভবনটি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।”

ভূমিকম্পের সময় ফাবিয়ানা মায়ের শোবার ঘরে ছিল। কম্পন অনুভব করে সে রান্নাঘরে ছুটে যায় এবং রান্নাঘরের কাউন্টার আঁকড়ে ধরে। ঠিক তখনই চারপাশের দেয়াল ধসে পড়ে এবং সে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে।

ফাবিয়ানা স্মৃতিচারণ করে বলে, “সবকিছু কাঁপছিল, ভেঙে পড়ছিল। দেয়ালে ফাটল ধরল, পাশের ফ্ল্যাটের দেয়াল ভেঙে পড়ল। তখন মনে হয়েছিল, আমি মারা যাব। কেউ আমাকে উদ্ধার করতে পারবে না।”

ধ্বংসস্তূপের নিচে ৩২ ঘণ্টার বিভীষিকা
ভবনের বাইরে এসে কারিনা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মেয়ের বিছানার অর্ধেক অংশ দেখতে পান।

তিনি বলেন, “আমি পুরো এলাকাজুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছিলাম আর চিৎকার করছিলাম- ‘আমার মেয়ে মারা গেছে।’ তখন আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না।”

অন্যদিকে ধ্বংসস্তূপের নিচে ফাবিয়ানা চিত হয়ে আটকে ছিল। চারপাশে কংক্রিটের স্তূপ, আর ছাদের ভাঙা অংশ প্রায় তার মুখের সঙ্গে লেগে ছিল।

সে বলে, “আমি খুব সহজেই দমবন্ধ লাগা বা আতঙ্কে ভুগি। কিন্তু তখন অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। হয়তো মস্তিষ্ক তখনও ধাক্কা সামলাচ্ছিল।”

কিছুক্ষণ পর ওপরতলার বাসিন্দাদের পরিচর্যাকারী এক নার্স জীবিত কেউ আছে কি না জানতে চিৎকার করতে থাকেন। ফাবিয়ানা সাড়া দিলে তিনি তাকে সাহস জোগান।

ছয় ঘণ্টা পর, মধ্যরাতের দিকে ওই নার্সকে উদ্ধার করা হয়। বাইরে এসে তিনি উদ্ধারকর্মীদের জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে ফাবিয়ানা নামে একটি মেয়ে এখনও জীবিত রয়েছে।

এ খবর শুনে কারিনার জীবনে যেন নতুন আশার আলো ফিরে আসে।

তিনি বলেন, “আমি তখন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিলাম, যেন ফাবিয়ানাকে ছাড়া নতুন জীবন শুরু করার শক্তি পাই। ঠিক তখনই কেউ এসে বলল- ‘আপনার মেয়ে বেঁচে আছে’।”

কেচাপ আর চিজ খেয়েই টিকে থাকা
ধ্বংসস্তূপের নিচে ফাবিয়ানা কোনও আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল না।
সে জানায়, “কী কারণে জানি না, কিন্তু আমার মনে আশা ছিল। একটি পা অস্বাভাবিকভাবে বাঁকানো অবস্থায় ছিল। সেটি সোজা করতে গিয়ে কিছু ইট-পাথর সরাই। তখনই একটি কেচাপের বোতল আর কিছু কুচানো চিজ পাই। সেগুলো খেয়েই আমি জ্ঞান ধরে রাখতে পেরেছিলাম।”

স্বেচ্ছাসেবকই হয়ে ওঠেন নায়ক
পরদিন সকালে দমকলকর্মীরা এসে ফাবিয়ানাকে খুঁজলেও তার কোনও সাড়া পাননি। পরে তারা জানিয়ে দেন, আর কিছু করার নেই।

কারিনা বলেন, “তখন মনে হচ্ছিল হয়তো দমবন্ধ হয়ে সে মারা গেছে। ঠিক সেই সময় একজন স্বেচ্ছাসেবক এগিয়ে এলেন। তার নাম ভিক্টর। তিনি আমার কাছে সত্যিকারের নায়ক।”

এদিকে ধ্বংসস্তূপের নিচে নিজের মোবাইল ফোন খুঁজে পান ফাবিয়ানা। মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকলেও তিনি একটি ভিডিও ধারণ করেন, যাতে পরে সুযোগ পেলে কারও কাছে পাঠাতে পারেন।

ভিডিওতে ফাবিয়ানা বলেন, “রিতামার প্যালেস অ্যাপার্টমেন্ট। ভূমিকম্প হয়েছে। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ। কোনও আলো নেই। কেউ আমাদের উদ্ধার করতে আসেনি। আমি একা আছি। অনেক প্রতিবেশীও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন। আমাদের সাহায্য করুন।”

এদিকে স্বেচ্ছাসেবক ভিক্টর ধ্বংসস্তূপের ওপরে উঠে বারবার ডাকতে থাকেন। এবার ফাবিয়ানা তার ডাক শুনে উত্তর দেয়।

ভিক্টর দ্রুত কারিনাকে জানান, তার মেয়ে জীবিত।

কারিনা বলেন, “আমি সবাইকে চিৎকার করে বললাম- ‘আমার মেয়ে বেঁচে আছে।’ এরপর মানুষ দলে দলে এসে উদ্ধারকাজে যোগ দেয়।”

৩২ ঘণ্টা পর অলৌকিক উদ্ধার
এরপর আরও কয়েকটি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। রাত নেমে আসার পরও উদ্ধার অভিযান বন্ধ হয়নি।

কারিনা টর্চলাইটের ব্যবস্থা করেন। কয়েকটি মোটরসাইকেল ও গাড়ির হেডলাইটের আলোয় ধ্বংসস্তূপ কাটার কাজ চলতে থাকে।

অবশেষে ধ্বংসস্তূপে একটি ছোট ছিদ্র তৈরি হয়, যার ভেতর দিয়ে ফাবিয়ানাকে দেখা যায়।

হাসিমুখে সেই ছোট্ট ছিদ্র দিয়ে তাকিয়ে থাকা ফাবিয়ানার ভিডিও পরে ভেনেজুয়েলাজুড়ে ভাইরাল হয়ে যায়।

ফাবিয়ানা বলেন, “এত ঘণ্টা আটকে থাকার পর যখন উদ্ধারকারীদের দেখলাম, তখন বুঝতে পারলাম আমি বেঁচে ফিরব।”

স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত দুইটার দিকে, অর্থাৎ ভূমিকম্পের প্রায় ৩২ ঘণ্টা পর উদ্ধারকারীরা যথেষ্ট বড় একটি সুড়ঙ্গ তৈরি করতে সক্ষম হন। সেই পথ দিয়েই ফাবিয়ানাকে জীবিত বের করে আনা হয়।

উদ্ধারকর্মীদের সহায়তায় ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে এসেই সে মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

ফাবিয়ানা বলেন, “বাইরে এসে পুরো ভবনটিকে ধসে পড়া অবস্থায় দেখে মনে হচ্ছিল, যেন কোনও সিনেমা বা টেলিভিশন সিরিজ দেখছি।”

বেঁচে ফিরেছেন মাত্র তিনজন
কারিনা জানান, তাদের ভবনে প্রায় ৫০ জন বাসিন্দা ছিলেন। তাদের মধ্যে মাত্র তিনজন জীবিত উদ্ধার হয়েছেন।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, রবিবার পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার ওই ভূমিকম্পে ৩ হাজার ৩৪২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, আর এখনও নিখোঁজ রয়েছে কয়েক হাজার মানুষ।
অলৌকিকভাবে ফাবিয়ানার বাম পায়ে একটি হাড় ভাঙা এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে সামান্য আঁচড় ও আঘাত ছাড়া বড় কোনও শারীরিক ক্ষতি হয়নি। বর্তমানে সে তার নানীর বাড়িতে রয়েছে। তবে মানসিকভাবে এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেনি।

ফাবিয়ানা বলে, “শুরুর দিকে চিত হয়ে শুতে খুব ভয় লাগত। তখনই ধ্বংসস্তূপের নিচে কাটানো সময়ের কথা মনে পড়ে যেত।”

বর্তমানে তাদের নতুন বাড়ির আশপাশেও অসংখ্য ধসে পড়া ভবন দেখা যায়।

কারিনা বলেন, “চারদিকে শুধু শোক আর কষ্ট। প্রতিবেশী আর বন্ধুদের কথা মনে পড়লে খুব কষ্ট হয়। স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। কিন্তু আমাদের সামনে এগিয়ে যেতেই হবে। একজন মায়ের আর কী চাই? আমার মেয়ে বেঁচে আছে- এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।” সূত্র: বিবিসি

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us
Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031