ছবি: সংগৃহীত
ইরান যুদ্ধের শুরু থেকেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি বড় ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। এবার মধ্যপ্রাচ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ লোহিত সাগরও নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বৈশ্বিক বাজারে তেল সরবরাহ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের বিধিনিষেধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনে বাধা তৈরি হওয়ায় সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোকে বিকল্প পথের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে লোহিত সাগরকেন্দ্রিক রুট। তবে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের দিকে ইরান-সমর্থিত হুথিদের অগ্রযাত্রায় এবার বাব আল-মান্দাব প্রণালি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এই সরু জলপথটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
ইয়েমেনের সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সিএনএন জানিয়েছে, হুথিরা কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখল করেছে। একই সঙ্গে বাব আল-মান্দাব প্রণালির ঠিক কাছে অবস্থিত পেরিম দ্বীপও তারা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে চলাচলকারী জাহাজকে হুমকি দেওয়ার সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমেছে
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে সেই সংখ্যা কমে গড়ে মাত্র ১৯টিতে দাঁড়িয়েছে বলে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী তথ্যের বরাত দিয়ে জানিয়েছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) কেপলার মাত্র ৯টি জাহাজকে প্রণালিটি অতিক্রম করতে দেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ইরানের উপকূল থেকে দূরে ওমানের কাছাকাছি জলসীমা দিয়ে কিছু জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে সক্ষম হলেও এ কার্যক্রম ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
জুলাই ও আগস্টে ওমানের কাছাকাছি জলসীমায় অন্তত ২৩টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ২২ জন নাবিক নিহত হয়েছেন। ফলে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে চলাচলে অভ্যস্ত জাহাজ মালিকদের অনেকেই এখন ওই এলাকায় প্রবেশে অনীহা দেখাচ্ছেন। এর প্রভাব তেল রপ্তানিতেও পড়েছে। উইন্ডওয়ার্ডের বিশ্লেষক মিশেল উইজ বকম্যানের তথ্য অনুযায়ী, ইরান বাদে উপসাগরীয় দেশগুলোর অপরিশোধিত তেল রপ্তানি আগস্টে যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।
বিকল্প পথ হিসেবে লোহিত সাগর
উপসাগরীয় অন্য অনেক দেশের তুলনায় সৌদি আরবের একটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে। দেশটির ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে পশ্চিম দিকে তেল পাঠিয়ে লোহিত সাগরের টার্মিনাল দিয়ে রপ্তানি করা যায়। এতে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে পাইপলাইনটিতে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটে। তাই পাইপলাইনটি বন্ধ করা হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে প্রথম হামলা চালানোর পর ইরান হরমুজে চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করলে এই বিকল্প পথটির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। লোহিত সাগর থেকে জাহাজ দক্ষিণ দিকে বাব আল-মান্দাব হয়ে এশিয়ার দিকে যেতে পারে। আবার উত্তর দিকে গিয়ে সুয়েজ খাল ও ভূমধ্যসাগরেও প্রবেশ করা যায়।
তেল পরিবহনের বিকল্প পথগুলো
হরমুজ প্রণালি: উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানির প্রধান ঐতিহ্যবাহী পথ। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ চলাচল করলেও সেপ্টেম্বরে তা গড়ে ১৯টিতে নেমে এসেছে।
সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন: হরমুজ এড়িয়ে সৌদি আরবের ভেতর দিয়ে তেল লোহিত সাগরে পৌঁছানোর সুযোগ দেয়। শুক্রবার সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাইপলাইনটি একাধিকবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এটি বন্ধ রাখা হয়েছে।
বাব আল-মান্দাব: লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। মোখা ও পেরিমে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘটনায় এই পথে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়েছে।
সুয়েজ খাল–ভূমধ্যসাগরীয় রুট: লোহিত সাগর থেকে সৌদি তেল বের করে নেয়ার আরেকটি পথ। তবে এশিয়ার বাজারে তেল পাঠাতে এই রুট ব্যবহার করলে যাত্রাপথ দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল হয়।
বাব আল-মান্দাবেও বাড়ছে চাপ
হুথিদের মোখা ও পেরিম দখল বাব আল-মান্দাবের আশপাশে তাদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে লোহিত সাগর থেকে বাব আল-মান্দাব হয়ে মাত্র দুটি সৌদি কার্গো জাহাজ চলাচল করেছে। এর পাশাপাশি সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বিকল্প আছে, তবে খরচ বেশি
সৌদি আরবের জন্য এখনো একটি বিকল্প পথ খোলা রয়েছে। লোহিত সাগরে পৌঁছানো তেল দক্ষিণে বাব আল-মান্দাব দিয়ে না পাঠিয়ে উত্তর দিকে সুয়েজ খাল ও ভূমধ্যসাগরের দিকে পাঠানো যেতে পারে। তবে সৌদি আরবের অন্যতম বড় ক্রেতা এশিয়ার দেশগুলোতে তেল পাঠাতে হলে এই পথ অনেক দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল। ফলে হরমুজের বিকল্প হিসেবে যে ভৌগোলিক সুবিধা সৌদি আরব এতদিন পেয়ে এসেছে, সেটিও এখন নতুন জটিলতার মুখে পড়ছে।
বাব আল-মান্দাবে কার্যকর অবরোধ তৈরি হলে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রকে আরও সামরিক শক্তি মোতায়েন করতে হতে পারে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সচল রাখতেও মার্কিন বাহিনী কাজ করছে। ফলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ একসঙ্গে সুরক্ষিত রাখা ওয়াশিংটনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সিএনএন’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে লোহিত সাগরে অতিরিক্ত সামরিক হস্তক্ষেপ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।
বিশ্ববাজারে তেলের দামে চাপ
ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির প্রভাব ইতোমধ্যে জ্বালানি বাজারে দেখা যাচ্ছে। হুথিদের হামলা বেড়ে যাওয়ার পর শুক্রবার তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা যুদ্ধ শুরুর আগের দামের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, এর প্রভাব পড়ছে অন্যান্য জ্বালানির বাজারেও। যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম ৪ ডলারের ওপরে উঠেছে। ট্রাক পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে গুরুত্বপূর্ণ ডিজেলের দামও প্রতি গ্যালনে ৬ ডলারের ওপরে পৌঁছেছে।
তবে মূল সংকটটি এমন নয় যে মধ্যপ্রাচ্যের তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর কোনো পথই থাকবে না। বরং অবশিষ্ট পথগুলো ক্রমেই আরও ঝুঁকিপূর্ণ, ব্যয়বহুল এবং সামরিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। অর্থাৎ, দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজকে কেন্দ্র করে চলা সংঘাত এখন দ্বিতীয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপরও চাপ তৈরি করছে। তথ্যসূত্র: গালফ নিউজ, সিএনএন, রয়টার্স।