মিলেমিশে থাকাই বাংলাদেশের মানুষের আবহমানকালের মূল্যবোধ : প্রধানমন্ত্রী ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, অপশক্তি নিজেদের হীন দলীয় স্বার্থে মানুষের মধ্যে বিভেদ ও বিরোধ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালালেও সবাই মিলেমিশে থাকাই বাংলাদেশের মানুষের আবহমান কালের মূল মূল্যবোধ। বর্তমান সরকার এমন এক রাষ্ট্র এবং সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে কাজ করছে, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে বসবাস করবে। শুধু মানুষের নিরাপত্তাই নয়, কোনো প্রাণীও যেন মানুষের হিংস্রতার শিকার না হয়, বর্তমান সরকার সেটিও নিশ্চিত করতে চায়।
বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে বছরব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটিতে প্রধানমন্ত্রী নজরুল বর্ষের স্মারক ডাকটিকিট ও লোগো উন্মোচন করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করেননি, তবে তার হৃদয়জুড়ে ছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশও তাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে। কিশোর বয়সে ১৯১৪ সালে কবি প্রথমবারের মতো ময়মনসিংহের ত্রিশালে এসেছিলেন। কবির স্মৃতিধন্য সেই ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ হিসেবে ঘোষণা করার সম্ভাব্যতা বর্তমানে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর পাশাপাশি সরকার ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সময়কালকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
তিনি বলেন, জাতীয় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের তিনি এক অবিস্মরণীয় নাম। পরাধীন, পর্যুদস্ত ও পরাভূত জাতির ভাগ্যাকাশে তার আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতো। পরাধীনতা, জুলুম, শোষণ, অসাম্য, বৈষম্য ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কবির কলম ছিল শানিত অস্ত্র। বিপ্লব-বিদ্রোহ, রণ-সংগীত, ইসলামী তাহজীব-তমদ্দুন বা ইসলামী মূল্যবোধের গান; কিংবা ভজন-কীর্তন ও শ্যামা সংগীত, প্রেম-প্রকৃতি কিংবা মানবিক মূল্যবোধ— প্রতিটি ক্ষেত্রেই নজরুল আমাদের শুদ্ধ প্রকাশ এবং মাতৃভূমিকে ভালোবাসার প্রধান দিশারি। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সব আন্দোলন-সংগ্রামে কবির সৃষ্টিশীলতাই প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মূল ভাষা হয়ে উঠেছিল।
অনুষ্ঠানের ফরম্যাট ও আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকা নিয়ে নিজের স্পষ্ট ও খোলামেলা উপলব্ধি ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে অনেক সরকারি কর্মকর্তা, নজরুল গবেষক ও শিল্পী উপস্থিত ছিলেন।
তবে অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রের একটি বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে লেখা হয়েছে—‘সকল বিভাগীয় কমিশনার, জেলা এবং নির্বাচিত ৭৪টি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণ ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকবেন’। এর পরিবর্তে আমন্ত্রণপত্রে যদি লেখা থাকত—‘সকল বিভাগীয়, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে নজরুল গবেষক, নজরুল শিল্পী ও নজরুলপ্রেমীগণ ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকবেন’, সেটি বরং বেশি যৌক্তিক এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো বলে আমার বিশ্বাস।
নিজের এ উপলব্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কিংবা ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ অনুষ্ঠানে যদি বলা হয় ‘নজরুল গবেষক বা শিল্পীরা ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকবেন’, তা যেমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ; ঠিক একইভাবে নজরুল বর্ষ উদযাপনে আমলা বা সরকারি কর্মকর্তাদের এভাবে যুক্ত করার কথাটিও উদ্দেশ্যের সঙ্গে বেমানান।
তিনি কবিকে নিয়ে আলোচনা মন্ত্রণালয় বা সরকারি অফিসের চার দেয়ালের আবদ্ধতা থেকে বের করে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার তাগিদ দেন।
বর্তমান প্রযুক্তির যুগের জটিল বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তথ্য-প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সীমাহীন ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব আমাদের নতুন প্রজন্মের সামনে যেমন জ্ঞানের দুয়ার খুলে দিয়েছে। ঠিক তেমনই মূল্যবোধ হারিয়ে বিপথগামী হওয়ার পথও উন্মুক্ত করেছে।
এমন সময়ে নজরুলের ‘আমি হবো সকাল বেলার পাখী’ কিংবা ‘থাকবো নাকো বদ্ধ করে, দেখবো এবার জগৎটাকে’— এ ধরনের নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন ছড়া ও কবিতা উদীয়মান প্রজন্মের সামনে আশা জাগানিয়া আলো দেখাতে পারে। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার কাছে মনে হয়, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলেন ‘বাংলাদেশের মন’।
আজ থেকে শুরু হওয়া এই নজরুল বর্ষ উদযাপনে বছরজুড়ে সাহিত্য সম্মেলন, গবেষণা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক উৎসব, নজরুল সংগীতের আসর, প্রকাশনা কার্যক্রম, নাট্যোৎসব এবং চিত্র প্রদর্শনীসহ নানা আয়োজন থাকবে। এছাড়া, ডিজিটাল মাধ্যমে কবির সাহিত্য ও সংগীত সংরক্ষণ এবং তা আন্তর্জাতিক পরিসরে বহুভাষিক অনুবাদের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সারা দেশে নজরুলপ্রেমীদের নিয়ে গঠিত ‘নজরুল বর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটির’ মাধ্যমে দেশের সব জেলা-উপজেলা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে প্রতিটি অনুষ্ঠান সফলভাবে পালন করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে এ বর্ষের কর্মসূচির উদ্বোধন ঘোষণা করেন।