ছবি: সংগৃহীত
ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা নিয়ে নানা সময়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত এসব স্থাপনাকে তিনি কখনও প্রকাশ্যে ‘মাদক কারখানা’ বলে দাবি করেননি। ওকলাহোমায় এক সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে হঠাৎ করেই ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে ‘ড্রাগ ফ্যাক্টরি’ বা মাদক কারখানা হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
ট্রাম্পের এই মন্তব্য শুধু সাধারণ মার্কিন নাগরিকদেরই নয়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদেরও বিস্মিত করেছে।
কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের নিউক্লিয়ার পলিসি প্রোগ্রামের সহপরিচালক জেমস অ্যাক্টন বলেন, “এটা আমার জন্যও নতুন।”
শুক্রবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক ই-মেইল বার্তায় তিনি বলেন, তার জানা মতে, ইরানের ফোরদো স্থাপনাটি কখনও মাদক উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হয়নি। এমনকি বিশ্বাসযোগ্য বা অবিশ্বাস্য- কোনও ধরনের অভিযোগের কথাও তিনি আগে শোনেননি যে, সেখানে মাদক উৎপাদন করা হতো।
সিএনএন এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের কাছে ব্যাখ্যা জানতে চাইলেও ট্রাম্পের বক্তব্যের কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
কী বলেছিলেন ট্রাম্প?
ট্রাম্পের মন্তব্যটি আসে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান নিয়ে কথা বলার সময়। গত বছরের জুনে ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামে পরিচালিত অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এসব স্থাপনার মধ্যে ফোরদোও ছিল।
ওকলাহোমার সমাবেশে ওই হামলার বর্ণনা দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, গভীর রাতে চাঁদের আলো না থাকা অবস্থায় মার্কিন বোমারু বিমানগুলো ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ফোরদো স্থাপনার বায়ু চলাচলের পথ দিয়ে বোমা ঢোকানোর কথা বলতে গিয়ে তিনি হঠাৎ সেটিকে ‘ড্রাগ ফ্যাক্টরি’ বলে উল্লেখ করেন।
এরপর নিজের বক্তব্য সংশোধন না করে তিনি আরও কয়েকবার ‘মাদক ও পারমাণবিক কারখানা’ বলে একই দাবি পুনরাবৃত্তি করেন।
ট্রাম্প বলেন, এসব স্থাপনায় ‘পারমাণবিক ও মাদক’- দুই ধরনের কার্যক্রমই চলছিল। তবে তিনি কী ধরনের মাদক উৎপাদনের কথা বলছেন বা এর কোনও প্রমাণ কী, সে বিষয়ে কোনও তথ্য দেননি।
কেন এমন বললেন ট্রাম্প?
ট্রাম্প কেন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাকে মাদক কারখানা বললেন, এর নিশ্চিত কোনও ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি। তবে তার পুরো বক্তব্যের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করে একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা সামনে এসেছে- তিনি হয়তো আগের প্রসঙ্গে ব্যবহৃত ‘ড্রাগ’ শব্দটি ভুল করে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার প্রসঙ্গে ব্যবহার করেছেন।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান নিয়ে কথা বলার ঠিক আগে ট্রাম্প ক্যারিবীয় অঞ্চলে অবৈধ মাদক পাচার ঠেকাতে তার প্রশাসনের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে পরিচালিত মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন।
এরপরই তিনি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার কথা বলতে শুরু করেন। ফলে আগের প্রসঙ্গে বারবার ব্যবহৃত ‘ড্রাগ’ শব্দটি ভুলক্রমে পরবর্তী বক্তব্যে চলে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এটি নিছক কথার ভুল ছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
ভুল সংশোধনের বদলে আরও জোর দিয়ে বললেন
সিএনএনের প্রতিবেদনে ট্রাম্পের বক্তব্যের আরেকটি দিক তুলে ধরা হয়েছে। তিনি অতীতে প্রকাশ্য বক্তব্যে কোনও শব্দ বা তথ্য ভুল বললেও অনেক সময় সেটি সরাসরি সংশোধন না করে নিজের বক্তব্যকে আরও জোর দিয়ে উপস্থাপন করেছেন- এমন উদাহরণ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফোরদোকে ‘মাদক কারখানা’ বলার ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ‘ড্রাগ ফ্যাক্টরি’ বলার পর বক্তব্য সংশোধনের পরিবর্তে ট্রাম্প আরও কয়েকটি বাক্যে একই ধারণা পুনরাবৃত্তি করেন।
তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের এই ব্যাখ্যাটি সিএনএনের বিশ্লেষণ; হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে কোনও ব্যাখ্যা দেয়নি।
পারমাণবিক স্থাপনায় ওষুধ তৈরির বিষয়টি কি এর সঙ্গে যুক্ত?
ট্রাম্পের বক্তব্যের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে বিশেষজ্ঞ জেমস অ্যাক্টন একটি ভিন্ন সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, ইরান অতীতে কখনও কখনও উল্লেখ করেছে যে, পারমাণবিক চুল্লিতে ‘রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল’ বা তেজস্ক্রিয় ওষুধ তৈরি করা যায়। এসব পদার্থ বিভিন্ন রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
তবে অ্যাক্টনের মতে, ফোরদো স্থাপনার ক্ষেত্রে এই ব্যাখ্যাও খাটে না। কারণ ফোরদো মূলত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র; সেখানে কোনও পারমাণবিক চুল্লি নেই।
তাই ইরানে পারমাণবিক প্রযুক্তির মাধ্যমে চিকিৎসায় ব্যবহৃত রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল উৎপাদনের বিষয়টি বিবেচনায় নিলেও ফোরদোকে ‘মাদক কারখানা’ হিসেবে বর্ণনা করা সঠিক হবে না বলে তিনি মনে করেন।
হোয়াইট হাউসের ব্যাখ্যা মেলেনি
ট্রাম্পের বক্তব্যের ব্যাখ্যা জানতে সিএনএন হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনও বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা শুধু ট্রাম্পের নিজের মন্তব্যের দিকেই সাংবাদিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
ফলে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মাদক উৎপাদনের কোনও নির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ ট্রাম্পের কাছে রয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞ অ্যাক্টনের বক্তব্য অনুযায়ী, ফোরদোতে মাদক উৎপাদনের কোনও বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগের কথা তার জানা নেই। আর ট্রাম্পের বক্তব্যের ঠিক আগের অংশে ক্যারিবীয় অঞ্চলে অবৈধ মাদক পাচারের প্রসঙ্গ থাকায়, ‘ড্রাগ ফ্যাক্টরি’ কথাটি সেখান থেকেই ভুলক্রমে চলে আসার সম্ভাবনাই তুলনামূলকভাবে সরল ব্যাখ্যা হতে পারে।
তবে ট্রাম্প বা তার প্রশাসন রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রকাশ্যে এমন কোনও ব্যাখ্যা দেয়নি। সূত্র: সিএনএন