ছবি: সংগৃহীত
১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে মানব ইতিহাসের প্রথম ও একমাত্র পারমাণবিক বোমাবর্ষণের ৮১ বছর পূর্ণ হলো। তৎকালীন মার্কিন হামলায় মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল দুটি সমৃদ্ধ শহর। তেজস্ক্রিয়তা ও জখমের কারণে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় আড়াই লাখ মানুষ। যাদের বেশির ভাগই ছিলেন নিরীহ বেসামরিক নাগরিক।
আট দশক পার হলেও এই হামলার যৌক্তিকতা, নৈতিকতা ও আইনি ভিত্তি নিয়ে বিতর্ক আজও তীব্র। একপক্ষের মতে, এই কঠোর সিদ্ধান্ত জাপানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেছিল এবং সম্ভাব্য স্থল অভিযান এড়িয়ে উভয় পক্ষের লাখ লাখ সেনার জীবন বাঁচিয়েছিল। অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, এটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও যুদ্ধাপরাধ। কারণ তৎকালীন নৌ-অবরোধ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধে যোগদানের ফলেই জাপান ধ্বংসের মুখে ছিল, ফলে পরমাণু বোমার ব্যবহার সামরিক দিক থেকে অপ্রয়োজনীয় ছিল। অনেকের মতে, এই ধ্বংসযজ্ঞের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নতুন অস্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে শক্তি প্রদর্শন করা।
ভয়াবহ সেই স্মৃতি বহন করেই আজ বিশ্ব পৌঁছেছে এক নতুন পারমাণবিক বাস্তবতায়। স্নায়ুযুদ্ধের তুঙ্গে যখন বিশ্বে প্রায় ৭০ হাজার পারমাণবিক অস্ত্র মজুত ছিল, সেই তুলনায় বর্তমান সংখ্যাটি অনেক কম হলেও তা পুরো মানবজাতিকে বহুবার ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সামরিক শক্তিগুলোর হাতে ১২ হাজারের বেশি পরমাণু ওয়ারহেড মজুত রয়েছে। এই বিশাল সমরাস্ত্রের সিংহভাগই দখল করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া, যাদের যৌথ ভাণ্ডারে রয়েছে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার ওয়ারহেড। এর মধ্যে রাশিয়ার সক্রিয় ওয়ারহেড প্রায় ৪ হাজার ৪০০টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩ হাজার ৭০০টি। ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত বা মোতায়েনকৃত অস্ত্রের দিক থেকে দুই দেশই প্রায় সমতা বজায় রাখছে, রাশিয়ার মোতায়েনকৃত ওয়ারহেড প্রায় ১৮০০টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১৭০০টি। জল, স্থল ও আকাশ; তিন পথেই পারমাণবিক হামলা চালানোর সামরিক সক্ষমতা এই দুই পরাশক্তিরই রয়েছে।
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তির অধিকারী চীন বর্তমানে দ্রুত তাদের সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে। বেইজিংয়ের হাতে প্রায় ৬২০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে, যার বড় অংশই সংরক্ষিত থাকলেও বর্তমানে প্রায় ৩৪টি ওয়ারহেড প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। তারাও সফলভাবে নিজেদের নিউক্লিয়ার ট্রায়াড জোরদার করছে। ইউরোপের দিকে তাকালে দেখা যায়, কেবল ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের নিজস্ব পারমাণবিক সমরাস্ত্র রয়েছে। ফ্রান্সের সংগ্রহে রয়েছে প্রায় ৩৭০টি ওয়ারহেড, যার মূল ভিত্তি তাদের সাবমেরিন ও যুদ্ধবিমান। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের হাতে রয়েছে প্রায় ২২০টি ওয়ারহেড, যার অর্ধেকের বেশি তাদের সাবমেরিনে মোতায়েন করা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির তেজস্ক্রিয় পদার্থ লিক হওয়ার ঘটনায় এর রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ছাড়া বেলজিয়াম, জার্মানি, ইতালি, তুরস্কের মতো ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে মার্কিন পারমাণবিক বোমা সংরক্ষিত রয়েছে এবং বেলারুশে রাশিয়ার কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দুই চিরপ্রদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিযোগিতা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য সার্বক্ষণিক উদ্বেগের কারণ। ভারতের হাতে বর্তমানে প্রায় ১৯০টি এবং পাকিস্তানের হাতে ১৭০টির মতো ওয়ারহেড রয়েছে। ভারত তাদের পরমাণু অস্ত্রের একটি অংশ মোতায়েনকৃত অবস্থায় আনার মাধ্যমে রণপ্রস্তুতি বাড়িয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণায় উঠে এসেছে। কৌশলগত দিক থেকে পাকিস্তান মূলত ফিশন বোমার ওপর নির্ভর করলেও ভারত থার্মোনিউক্লিয়ার অস্ত্রের মালিক কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়।
পারমাণবিক ক্লাবের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য উত্তর কোরিয়া ইতোমধ্যেই অন্তত ৬০টি ওয়ারহেড তৈরি করেছে। এগুলো তারা আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালাস্টিক মিসাইলে যুক্ত করতে সক্ষম। নৌপথে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সক্ষমতা অর্জন করলেও তাদের এখনো পূর্ণাঙ্গ আকাশভিত্তিক পারমাণবিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের উপস্থিতি স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটিই করে না, তবে আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী তাদের কাছে ৮০ থেকে ৯০টি পরমাণু বোমা ও ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। ১৯৮৬ সালে দেশটির সাবেক পরমাণু বিজ্ঞানী মরদেকাই ভানুনুর ফাঁস করা তথ্যে এই গোপনীয়তার পর্দা উঠে যায়। ৮১ বছর আগের হিরোশিমার ভস্মীভূত ধ্বংসস্তূপ মানবজাতিকে যে সতর্কবার্তা দিয়েছিল, বর্তমান বিশ্বের এই বিশাল পারমাণবিক রণসজ্জা প্রমাণ করে বিশ্ব রাজনীতি এখনো সেই ভয়াবহ শঙ্কার ছায়াতেই বাস করছে। সূত্র: আরটি